বিশেষ মতামত ও সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ, কলকাতা:
দুর্গাপুজোর আনন্দের আলোয় যখন আলোকিত গোটা তিলোত্তমা, ঠিক তখনই মধ্য কলকাতার রাজপথ থেকে শুরু হতে চলা রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে দানা বেঁধেছে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ। ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টের সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মৃতি উসকে দিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—উৎসবের মরশুমে রাজাবাজার থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত এই প্রস্তাবিত মিছিল কি তবে ফের কোনো বড় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার উসকানি? রাজ্য প্রশাসনের সর্বময় দায়িত্বে থাকা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং কঠোর পদক্ষেপের জোরালো দাবি তুলেছে নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ।
আরও পড়ুনঃ ‘সিপিকে নির্দেশ দিয়েছি, রাজাবাজার থেকে এক পা-ও নয়, দরকারে নামবে CRPF’; জানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী
১৯৪৬-এর স্মৃতি ও ভয়ের আবহ
ইতিহাসের পাতা উল্টালে আজও শিউরে ওঠে বাংলা। ১৯৪৬ সালের কোজাগরি লক্ষ্মীপুজোর দিন কিংবা তার আগে ১৬ আগস্টের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-তে রাজাবাজার, পার্ক সার্কাসের মতো মধ্য কলকাতার অলিগলি কীভাবে সাম্প্রদায়িক হিংসার আগুনে জ্বলে উঠেছিল, তা বঙ্গবাসীর মানসপটে আজও গভীর ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত। তৎকালীন সেই জিগির ও উন্মাদনার ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন, উৎসবের ঠিক মুখে এই স্পর্শকাতর রুটগুলিতে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি ডাকার নেপথ্যে আসল উদ্দেশ্য কী?
ঘরপোড়া গরুর মতো সিঁদুরে মেঘ দেখে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, পুলিশি বা প্রশাসনের সামান্য উদাসীনতা বা অপদার্থতা যদি ফের বাংলাকে অশান্তির আগুনে ঠেলে দেয়, তবে তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
প্রশাসনের ভূমিকা ও মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ইতিমধ্যেই কড়া অবস্থান নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার রাতে এক পুজো উদ্বোধনের মঞ্চ থেকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—রাজাবাজার থেকে এক পা-ও এগোতে দেওয়া হবে না এই মিছিলকে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় বাহিনী (Central Force) নামানোর হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন তিনি।
তবে শুধু মৌখিক হুঁশিয়ারিই যথেষ্ট নয়, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করে স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সীমান্তপারের অনুপ্রবেশকারী বা বহিরাগত কোনো শক্তি যদি উৎসবের আনন্দ মাটি করতে ছক কষে, তবে প্রশাসনকে যে লোহকঠিন হাতে তা দমন করতে হবে, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই।
আরও পড়ুনঃ দিল্লিজুড়ে সরকারের বিরুদ্ধে পারদ চড়তেই এবার কি মোদী মন্ত্রিসভায় বড়সড় রদবদল? জল্পনা তুঙ্গে
শান্তির আবেদন ও নাগরিকের বার্তা
রক্তাক্ত অতীতের পুনরাবৃত্তি আর দেখতে চায় না বাংলা। উৎসবের এই দিনগুলিতে সমস্ত রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব এবং বিশেষ করে বাংলার সংখ্যালঘু ভাই-বোনদের কাছেও আবেদন—কোনো ধরনের প্ররোচনা বা উসকানিতে পা দেবেন না। গুজবে কান না দিয়ে তিল তিল করে গড়ে ওঠা বাংলার অটুট সম্প্রীতি বজায় রাখাটাই এই মুহূর্তে প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্র দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর কাছে একটাই প্রার্থনা—সময় থাকতে চোখকান খোলা রাখুন। বাংলাকে রক্তে ভাসতে দেবেন না। উৎসবের এই মরশুমে তিলোত্তমা যেন কেবল আলোর রোশনাই আর ঢাকের আওয়াজে মুখরিত থাকে, সংঘাতের আগুনে নয়।


