জগন্নাথ কে…? স্নান যাত্রা কী…? কেন করা হয়…?? যেই গৌর, সেই কৃষ্ণ, সেই জগন্নাথ। ভগবান জগন্নাথদেব হলেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং যিনি জগতের নাথ বা জগদীশ্বর। সংস্কৃতি ভাষায় জগত অর্থে বিশ্ব এবং নাথ অর্থে-ঈশ্বর বোঝায়। সুতরাং জগন্নাথ শব্দের অর্থ হলো জগতের ঈশ্বর বা জগদীশ্বর। জগন্নাথ বড় আমুদে দেবতা। অর্ধসমাপ্ত একটি নিম কাঠের মূর্তি, যার হাত নেই, পা নেই কেবল আছে বড় গোল দুটি চোখ। তবুও গোটা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের নাথ তিনিই। জগন্নাথদেবের চোখের পাতা নেই। বিশ্বাস করা হয় তিনি কখনও ঘুমোতে যান না, জেগে থেকে দৃষ্টি রাখেন সকল ভক্তদের ওপর। যদিও মন্দিরে ‘পাহুডা’ বা বিশ্রামের নিয়ম রয়েছে, কিন্তু ওই স্বল্প সময়ের জন্যও তিনি ঘুমান না, বরং এই সময়ে দেবতারা তাঁর দর্শনে আসেন।
আরও পড়ুনঃ বিরোধী শূন্য জায়গাটি ভরাট করতে কোমর বাঁধছে আলিমুদ্দিন
তবে ভগবানের ও বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। স্নান পূর্ণিমায় ঘড়া ঘড়া জলে স্নান শেষে আসে ভীষণ জ্বর। ১০৮টি স্বর্ণ পাত্রে রাখা জলের সঙ্গে মেশানো হয় গঙ্গাজল, কাঁচা দুধ, আতর ও চন্দন। পাশাপাশি চলে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ, কীর্তন এবং শঙ্খধ্বনি। স্নানের পর ১০৮টি তুলসী পাতা জগন্নাথদেবের চরণে দিয়ে, জগন্নাথদেব ও বলরামকে সজ্জিত করা হয় গজ বেশে এবং সুভদ্রা দেবীকে পদ্ম বেশে। এতো এতো জলে স্নান সেরে অসুস্থ হয়ে পড়লে, তাঁদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় সংরক্ষিত গোপন কক্ষে। জগন্নাথের এই অসুস্থতার পর্যায়টি ‘অনবসর’ নামে পরিচিত। এই সময় ভক্তদের দর্শনের জন্য বিগ্রহের পরিবর্তে মূল মন্দিরে তিনটি পটচিত্র রাখা হয়। এছাড়াও এই সময় অনেকে ব্রহ্মগিরিতে অলরনাথ মন্দিরে যান। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন, অনসর পর্যায়ে জগন্নাথ অলরনাথ রূপে অবস্থান করেন। রাজবৈদ্যের চিকিৎসা এবং নানাবিধ ভেষজ উপাচারে একপক্ষ কালের মধ্যে সেরে ওঠেন তিন ভাইবোন। অতঃপর রথযাত্রার দিন সেজেগুজে সুসজ্জিত রথে চেপে মাসির বাড়ি বেড়াতে যান।
বাড়িতে থাকা বিগ্রহ এবং রাধাকৃষ্ণ অথবা গোপালকেও অনেকে স্নান পূর্ণিমাতে এইভাবে স্নান করান। আবার নিজেরাও গঙ্গাস্নানে যান। বাড়িতে থাকা মূর্তি গঙ্গাজল, ঘি, মধু, কেশর, কাঁচা দুধ ও চন্দন দিয়ে স্নান করিয়ে পড়াতে হয় হলুদ বস্ত্র। নিবেদন করতে হয় অন্ততঃ ২৮টি তুলসী পাতা। সঙ্গে লাল বা গোলাপী ফুল এবং হলুদ রঙের মিষ্টিজাতীয় পদ ও পাঁচ রকম ফল। স্নানযাত্রা আসলে ভক্তের সঙ্গে ভগবানের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের এক অপূর্ব প্রকাশ। এখানে পরমেশ্বর নিজেই মানুষের মতো অসুস্থ হন, বিশ্রাম নেন, চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসেন ভক্তদের মাঝে। সকলকে স্নান পূর্ণিমার শুভেচ্ছা।
স্কন্ধ পুরানে রথযাত্রার মহিমা বর্ননা করে বলা হয়েছে- যিনি গুন্ডিচা মন্দিরে (জগন্নাথের মাসীর বাড়ী) ভগবানের শ্রীবিগ্রহকে দর্শন করার সৌভাগ্য অর্জন করেন, তিনি সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ করেন।
আরও পড়ুনঃ অবশেষে বিশ্বমঞ্চে চন্দননগরের জলভরা! পেয়ে গেল অফিশিয়াল ‘জিআই ট্যাগ’
জগন্নাথদেবের স্নান যাত্রা আজ ২৯ জুন, সোমবাম্বার২৬ জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা মহোৎসব। ভগবান জগন্নাথদেবের আবির্ভাব তিথিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে জগন্নাথ দেবের এক বিশেষ স্নান যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। স্কন্ধ পুরাণ অনুসারে রাজা ইন্দ্রদুম্ন যখন জগন্নাথ দেবের কাঠের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করলেন তখন থেকে এই স্নানযাত্রা উৎসব শুরু। স্নান যাত্রার দিনটিকে জগন্নাথদেবের আবির্ভাব তিথি বা জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়। স্নান যাত্রার আগের দিন জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাদেবী এবং সুদর্শনদেবকে বেদী থেকে বিশেষ ভাবে তৈরি করা স্নান বেদীতে নিয়ে আসা হয়। পুরীর মন্দির প্রাঙ্গনে বিশেষ ভাবে তৈরি করা এই মণ্ডপকে বলা হয় স্নান মণ্ডপ। এটা এত উঁচু যে মন্দির প্রাঙ্গনের বাইরে থেকেও বেদিতে উপবিষ্ট বিগ্রহ সমূহ অবলোকন করা যায়। অনুষ্ঠানের দিন স্নান মণ্ডপকে ঐতিহ্যবাহী ফুল, বাগান ও গাছের চিত্রকলা দ্বারা সজ্জিত করা হয়। তোরণ এবং পতাকা দ্বারা সজ্জিত করা হয়। জগন্নাথ,বলরাম ও সুভদ্রাদেবীর বিগ্রহ ফুল দিয়ে সাজানো হয়। এর পর বিগ্রহের উদ্দেশ্যে ধুপ, ধুনা অর্পণ করা হয়। পুরীতে স্নানের জন্য সোনার তৈরি এক ধরনের কুয়া থেকে জল আনা হয়। জল আনার সময় পুরোহিতরা তাদের মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন যাতে জল তাদের মুখনিঃসৃত কোন কিছু দ্বারা এমনকি তাদের নিঃশ্বাস দ্বারা দূষিত না হয়। স্নান মহোৎসবের পূর্বে জগন্নাথ,বলরাম এবং সুভদ্রা দেবীকে সিল্কের কাপড় দ্বারা আবৃত করা হয় এবং তারপর লাল এক ধরনের পাউডার দিয়ে প্রলেপ দেওয়া হয়। ১০৮ টি স্বর্ণ পাত্র জল দ্বারা পূর্ণ থাকে। এই জল দ্বারা অভিষেক করা হয়। অভিষেকের সময় বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ, কীর্তন এবং শঙ্খ বাজানো হয়। এরপর জগন্নাথদেব এবং বলদেবকে গজ বেশে সাজানো হয়। এই সময় সুভদ্রাদেবীকে পদ্ম সাজে সাজানো হয়। স্নানযাত্রা উৎসবের পর ১৫ দিন ভগবানকে জনসাধারণ থেকে দূরে রাখা হয়। এই ১৫ দিন মন্দিরে কোন অনুষ্ঠান করা নিষেধ। এই সময় ভগবান জগন্নাথ , বলরাম এবং সুভদ্রা দেবীকে রতন বেদী নামে এক বিশেষ বেদীতে রাখা হয়। এই সময়কে বলা হয় অনবসর কাল মানে পূজা করার জন্য অযোগ্য সময়। স্নান করানোর ফলে বিগ্রহ সমূহ বিবর্ণ হয়ে যায়। এই ১৫ দিনে জগন্নাথ দেবকে আগের সাজে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৬ তম দিনে জগন্নাথদেবকে আবার সবার দর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।


