বিশেষ প্রতিবেদক:
“ইউরোপিয়ানস অ্যান্ড ডগস নট অ্যালাউড”— পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবের বাইরে ঝুলতে থাকা এই চরম বর্ণবিদ্বেষী ঔদ্ধত্যকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন মাত্র ২১ বছরের এক বাঙালি তরুণী। তিনি বীরাঙ্গনা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নায়ক ‘মাস্টারদা’ সূর্য সেনের নির্দেশে সেই ক্লাবে সফল সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিলেন প্রীতিলতা। আজ তাঁর আত্মাহুতি দিবসে সমগ্র দেশ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে এই মহান শহীদকে।
আরও পড়ুনঃ মা-ছেলের জন্মদিন একই দিনে, কোন ঘটনার জন্য ছেলের নাম ‘গোলা’ রেখেছিলেন মহুয়া
বিপ্লবী জীবনের সূচনা ও শিক্ষা
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রীতিলতা। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি স্বদেশের স্বাধীনতা ও নারী জাগরণের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন।
-
মেধাবী ছাত্রী ও ব্রিটিশদের প্রতিবন্ধকতা: কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে বি.এ. (স্নাতক) পরীক্ষায় পাশ করলেও, তাঁর ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কারণে ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁর পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত রাখে। (পরবর্তীতে ২০১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মরণোত্তর ডিগ্রি প্রদান করে)।
-
শিক্ষকতা ও গোপনে সংগঠন পরিচালনা: চট্টগ্রামে ফিরে তিনি নান্দনকানন অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। ১৯৩১ সালে বিপ্লবী কল্পনা দত্তের মাধ্যমে আত্মগোপনে থাকা ‘মাস্টারদা’ সূর্য সেনের সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটে। আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের রসদ ও বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ তিনি পরম সাহসিকতার সঙ্গে চালাতেন।
আরও পড়ুনঃ তোলপাড় ভাতার; শ্রেণিকক্ষে পঠনপাঠন চলাকালীন সময়ে শিক্ষকের চেয়ারে বসে ‘বিকশিত ভারত’ ইস্যুতে বক্তব্য বিজেপি নেতার
পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ ও আত্মবলিদান
১৯৩১ সালে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের প্রথম পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও, ১৯৩২ সালে মাস্টারদা এই অভিযানের দায়িত্ব দেন প্রীতিলতাকে।
| ঘটনার পর্যায় | বিবরণ |
| তারিখ ও পোশাক | ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২ রাত। প্রীতিলতা পুরুষবেশে (ধুতি ও পাঞ্জাবি) ১০-১২ জন বিপ্লবীর একটি দলকে নেতৃত্ব দেন। |
| অভিযান | সফলভাবে ক্লাবে প্রবেশ করে বোমা ও গুলি বর্ষণ করে শত্রুপক্ষকে তছনছ করে দেওয়া হয়। |
| আঘাত ও সিদ্ধান্ত | প্রীতিলতা গুলিতে আহত হন। ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা না দিয়ে মাস্টারদার নির্দেশ ও পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি সঙ্গে থাকা পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। |
মৃত্যুর সময় তাঁর পোশাকের পকেটে পাওয়া গিয়েছিল একটি আত্মনিবেদন পত্র, যাতে লেখা ছিল স্বদেশের মুক্তির জন্য নারীদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান।
বাংলা ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের এই আত্মত্যাগ শুধু ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়নি, বরং হাজার হাজার নারীকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার শক্তি জুগিয়েছিল। আজ এই শহীদ দিবসে এই অমর বিপ্লবীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।


