অমিত কুমার সিংহ ( অমিত বাবু ):
টোটো চালক বাবার লোন করা টাকায় বিশ্বমঞ্চে স্বর্ণপদক জয়! লোন করে পাঁচ বছর পাঁচ মাসের মেয়েকে যোগা খেলতে পাঠিয়েছিলেন টোটো চালক বাবা, আর সেই মেয়েই বিশ্ব যোগাসন মঞ্চ থেকে সোনা জিতের দেশের মুখ উজ্জ্বল করলো!
পাড়ার লোক বলেছিল, “ লোন করে খেলতে পাঠাতে হবে?” মেয়েকে নিয়ে কেন এত আদিখ্যেতা কেন?
হ্যাঁ সেই ছোট্ট মেয়েটি বাবার সেই অ’প’মা’নে’র জবাব দিল সোনার মেডেল দিয়ে।
আরও পড়ুনঃ “গুপ্তচরদের ডিজনিল্যান্ড”! ভেতর থেকেই সাহায্য ‘পুস্পাকে’! সর্ষের মধ্যে এখনো অনেক অনেক ভূত
সাফল্য জাত-পাত বা ব্যাংক ব্যালেন্স দেখে আসে না, সাফল্য আসে জেদ আর ত্যাগের মাটি থেকে। প্রতিভা কুঁড়েঘরে জন্মালেও তার সুগন্ধ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন যারা টোন-টিটকারি করেছিল, আজ আরাধ্যার হাতের সোনার মেডেল তাদের জন্য নীরব জবাব।
না মেয়েরা বোঝা নয়, সুযোগ পেলে ওরাই বংশের ও দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে ওঠে, এই ছোট্ট আরাধ্যা আরো একবার তা প্রমাণ করল!
শীতের রাতে যখন আমরা লেপের নিচে উষ্ণতা খুঁজি, তখন দিল্লির গাজিয়াবাদের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় একটা ৫ বছর ৫ মাসের শরীর ঘাম ঝরাচ্ছিল। না, সে কোনো খেলা করছিল না; সে ল’ড়া’ই করছিল দেশের সম্মানের জন্য। সে লড়াই করছিল নিজের বাবার আ’ত্ম’বি’শ্বা’সে’র জন্য। একপাশে ছিল দিল্লির সেই কনকনে শীত, আর অন্যপাশে ছিল বাবার লোন করা টাকার সেই পবিত্র দায়বদ্ধতা।
সেই ছোট্ট ল’ড়া’কু মেয়েটির নাম, আরাধ্যা পাল। বয়স মাত্র ৫ বছর ৫ মাস। কিন্তু তার কাঁধে আজ যে সাফল্যের মুকুট, তার ওজন অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের চেয়েও বেশি।
আরাধ্যার বাবা উত্তম পাল একসময় পরিযায়ী শ্রমিক ছিলেন। কোমরের গুরুতর চোট তার উপার্জনের রাস্তা বন্ধ করে দিলেও, মেয়ের স্বপ্নের রাস্তা বন্ধ হতে দেননি। আজ তিনি একজন টোটো চালক। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে মেয়ের জন্য গাজিয়াবাদ যাওয়ার টাকা ছিল না। কিন্তু উত্তম বাবু জানতেন, তার মেয়ের রক্তে লড়াই আছে। তাই সমাজের টোন-টিটকারি, আ’ত্মী’য়’দে’র বাঁকা চাহনি উপেক্ষা করে তিনি লোন নিয়েছিলেন মেয়ের জন্য, কি যেন বিশ্বমঞ্চে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে পারে। পাড়ার লোক বলেছিল, “মেয়েকে নিয়ে কেন এত আদিখ্যেতা? লোন করে খেলতে পাঠাতে হবে?”
হ্যাঁ, পাঠাতে হবে! কারণ উত্তম পালের মতো বাবারা জানেন, বিশ্বাস যখন পাহাড়ের মতো অটল হয়, তখন ঈশ্বরও পথ ছেড়ে দেন। মা কোয়েল পাল তার সামান্য সামর্থ্য দিয়ে সংসার সামলে আরাধ্যাকে বড় করেছেন। শিক্ষক সুদীপ্তা মাঝি, আইরিন পারভীন এবং প্রধান শিক্ষক প্রদীপ গুরিয়া মহাশয়ের হাত ধরে যে চারাগাছটি বড় হচ্ছিল, গত ২৭শে ডিসেম্বর তা এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হলো।
UYSF পরিচালিত ওয়ার্ল্ড কাপে আরাধ্যা যখন ভারতবর্ষের হয়ে স্বর্ণপদক জয় করল, তখন শুধু পাতিনান গ্রাম নয়, গর্বিত হলো গোটা দেশ। যারা একদিন টোন-টিটকারি করেছিল, আজ সেই সোনা দেখে তাদের মাথা নত হয়ে গেছে। আরাধ্যা প্রমাণ করে দিয়েছে, বাবা-মায়ের নিরব সমর্থন থাকলে একটা ৫ বছরের মেয়েও বিশ্ব জয় করতে পারে।
আরও পড়ুনঃ সুরেন্দ্রনাথের ছায়া আলিপুরদুয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে; ইউনিয়ন রুমে মদের বোতল, কন্ডোম, মাদকের সিরিঞ্জ
এই জয় কেবল আরাধ্যর নয়, এই জয় সেই সব দরিদ্র মা-বাবার, যারা প্রতিদিন অভাবের সাথে যুদ্ধ করেও সন্তানের চোখে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন বোনেন। মনে রাখবেন, অভাব সাময়িক, কিন্তু জেদ চিরস্থায়ী। আপনার মেয়েটি যদি সুযোগ পায়, তবে সেও পারবে আপনার বংশের নাম উজ্জ্বল করতে। মেয়েদেরকে বোঝা ভাববেন না, মেয়েদের কাছ থেকে সুযোগটাকে কেড়ে নেবেন না, দারিদ্র্যকে বাহানা করবেন না, বরং তাকে সিঁড়ি বানিয়ে সাফল্যের শিখরে উঠুন।
আরাধ্যা পাল আজ আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল, বয়স কোনো বাধা নয়, আর্থিক অভাবও কোনো দেওয়াল নয়। যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, কঠোর পরিশ্রম থাকে, তবে গাজিয়াবাদের হাড়কাঁপানো শীতও হার মানতে বাধ্য।
কুর্নিশ সেই বাবাকে, যিনি টোটো চালিয়েও, লোন করে দেশের জন্য সোনার মেয়ে তৈরি করেছেন। কুর্নিশ সেই ছোট্ট আরাধ্যাকে, যে তার বাবার প্রতিটি ঘামের ফোঁটার মর্যাদা রেখেছে। আভিজাত্য পোশাকে নয়, সাফল্যের মেডেলে থাকে।


