২০১৩ সালের ৭ জুন। উত্তর ২৪ পরগনার কামদুনিতে কলেজ ছাত্রীকে গণধর্ষণ করে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল। আবার গত বছর নদিয়ার কালীগঞ্জে উপনির্বাচনে জয়ের পর তৃণমূলের বিজয় মিছিল থেকে ছোড়া বোমায় মৃত্যু হয় ১০ বছরের তামান্না খাতুনের। আজ (বুধবার) বারুইপুরকাণ্ডে অন্যতম এক অভিযুক্তের এনকাউন্টারে মৃত্যুর পর মুখ খুললেন কামদুনির নির্যাতিতার ভাই ও দুই প্রতিবাদী মুখ মৌসুমী কয়াল ও টুম্পা কয়াল। পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করলেন তামান্নার মাও। কী বললেন তাঁরা?
বারুইপুরকাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্তের এনকাউন্টারে মৃত্যুর পর কামদুনির নির্যাতিতার ভাই বলেন, “বারুইপুরে এনকাউন্টার করে যে মারা হয়েছে, এরকম আমরা দেখতে চাই। আমাদের যে চারটে আসামি ঘুরে বেড়াচ্ছে, এরা ভয়ানকের থেকেও ভয়ানক। আমাকে ২ বার খুনের চেষ্টা করেছিলাম। অনেকবার আগের সরকারকে আমরা জানিয়েছিলাম। কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। আমি চাই, বারুইপুরে যেমন এনকাউন্টারে মারা হয়েছে, তেমনই আমাদের মামলায় যে চারজন আসামি বাইরে রয়েছে, তাদের এনকাউন্টার করে মারা হোক। আর যে দু’জন জেলের ভিতরে রয়েছে, তাদের কেন সরকার খাওয়াবে? তাদেরও এনকাউন্টার করে মারা হোক। তাহলে এই রাজ্যে ধর্ষণ বন্ধ হবে। ধর্ষণ করলে একটাই শাস্তি হোক এনকাউন্টার।”
আরও পড়ুনঃ বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ-খুনে পাকড়াও কবীর মোল্লা; গণপিটুনি ও পুলিশকে মারধরের ঘটনাতে গ্রেফতার ২০ জন
কামদুনির প্রতিবাদী মুখ মৌসুমী কয়াল বলেন, “এনকাউন্টার প্রয়োজন ছিল। গত ১৫ বছরে ধর্ষকদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল। বিচার হয়নি। ধর্ষকদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল। আজ কোথাও গিয়ে একটু শান্তি পেলাম। আমরা মায়েরা খুশি হয়েছি। তদন্তের পর এনকাউন্টার করে দেওয়া প্রয়োজন। আমরা মায়েরা ঘরে শান্তিতে থাকতে পারব। আমরাও চাই, কামদুনি থেকে আরজি করের ঘটনায় বিচার হোক। আমরা যে প্রতিবাদ করেছিলাম, আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? ধর্ষকদের ছেড়ে দেওয়া হলে আমাদের উপরও হামলা হতে পারে। বারুইপুরে আরও যারা জড়িত তাদেরও এনকাউন্টার হোক। কামদুনি ও আরজি করের ঘটনায় এরকম ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন মৌসুমী। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, “আমরা চাই বিচার হোক। আমরা অনেক কষ্ট করেছি। আর আমরা চাই না, এই রাজ্যে আর কোনও মেয়ে, বাচ্চাকে ধর্ষণ করে খুন করা হোক। বিগত সরকারের উপর ভরসা রেখে বিভিন্ন জায়গায় ছুটেছি। কিন্তু, কী হল? ফাঁসির আসামি বেকসুর খালাস পেয়েছে। এনকাউন্টার প্রয়োজন।”
আরও পড়ুনঃ ‘ঠিক হয়েছে, ভালো হয়েছে’, এনকাউন্টার নিয়ে বললেন মৃত প্রভাসের মা
কামদুনির আর এক প্রতিবাদী মুখ টুম্পা কয়াল বলেন, “বারুইপুরের ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তাদের মনুষ্যত্ব বিবেক বলে কিছু নেই। বিগত ১৫ বছর ধরে বাংলার মানুষ দেখেছে, জঘন্যতম সাজা করলেও কোনও সাজা হয় না। ফলে এই ঘটনা ঘটার জন্য দায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু, এখনও যদি কেউ ভাবেন, এরকম নৃশংস কাজ করলে কিছু হবে না, তারা ভুল করছে।”
মমতাকে নিশানা করে টুম্পা বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সঠিক বিচার দিতেন, আজকে এরকম ঘটনা ঘটত না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্ষণ নিয়ে নানা কথা বলতেন। ওসব না বলে যদি দোষীদের সাজা দিতেন, তাহলে আজকে এটা ঘটত না। ভোটব্যাঙ্ক বাঁচাতে কামদুনিতেও অভিযুক্তদের বাঁচাতে ১৪ জন সরকারি আইনজীবী বদলেছিলেন। তাদের বেকসুর খালাস করে দেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমি মনে করি, প্রত্যেক দোষীকে এনকাউন্টার করা উচিত। কারণ, এনকাউন্টার করলে মমতার দেখানো পথে আসামিরা আর চলবে না।”
তামান্নার মা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “একদম ঠিক কাজ করেছেন। এসব ক্রিমিনালরা যখনই কোনও মহিলা, বাচ্চাদের দিকে কুদৃষ্টিতে তাকায়, তখনই তাদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার উপযুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু, তেমন হয় না। শাস্তি হয় না। এজন্য ক্রিমিনাল বাড়তে থাকে। এই এনকাউন্টারের পর ক্রিমিনাল কমতে থাকবে। এবার অপরাধীরা ভয় পাবে। তৃণমূলের আমলে অপরাধীর সংখ্যা বেড়েছিল।”
তাঁর মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন সরকার যেভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে, তার প্রশংসা করে সাবিনা বলেন, “আমি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অপরাধীদের গ্রেফতারেরর দাবি জানিয়েছিলাম। সেটা হয়েছে। ২৪ জনের কঠোর শাস্তি চেয়েছি। সব প্রমাণ রয়েছে। সেটা হবে বলে আমি আশাবাদী। মায়েদের কোল থেকে বাচ্চাদের ছিনিয়ে নিলে মায়েরা খুশি হতে পারবে না। তবে সান্ত্বনা হচ্ছে, তামান্নার অপরাধীরা সব ভেতরে গিয়েছে। বারুইপুরে একজনকে এনকাউন্টার করেছে। এর জন্য একটু স্বস্তি পাচ্ছি। পুলিশ ঠিকঠাক কাজ করেছে। পুলিশের দায়িত্ব পুলিশ পালন করেছে।”


