চন্দন দাসঃ
কলকাতা কি আজ একটি অভিশপ্ত ধ্বংসোন্মুখ নগরী? হাড়হিম করা চমক-টা এইখানেই। এই প্রশ্ন ২০২৬ সালে প্রথম ওঠেনি, উঠেছিল ১৯৭০-এর দশকে।
ভারতের ফিল্মস ডিভিশন দ্বারা ১৯৭০ সালে তৈরি করা অত্যন্ত বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিক সেই তথ্যচিত্রটির নামই ছিল “Calcutta – A Doomed City”।
পরিচালক বীরেন দাস-এর তৈরি ২৮ মিনিটের এই ল্যান্ডমার্ক ডকুমেন্টরিটি ইউটিউব এবং ইন্টারনেট আর্কাইভে আছে। আমি একটা অংশ তুলে দিলাম আপনাদের জন্য, দেখতে পারেন। দেখুন চিনতে পারেন কি?
আরও পড়ুনঃ বিবাহবিচ্ছেদের কাগজ ছিঁড়ে আদালতেই জড়িয়ে ধরলেন স্বামীকে! ভাইরাল শিখা-সৌরভ
সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে নকশাল আন্দোলন, ওপার বাংলা থেকে আসা লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর চাপ, বেকারত্ব এবং ভেঙে পড়া পরিকাঠামোর কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবী মহল কলকাতাকে একটি “ডুমড সিটি” বা “মৃত্যুন্মুখ নগরী” বলে আখ্যা দিতে শুরু করেছিল।
নজরটান সত্তরের দশকে লুই মালের মতো বিশ্বখ্যাত ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালকরা কলকাতার দারিদ্র্য ও ফুটপাথের জীবন নিয়ে ডকুমেন্টরি বানিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। লুই মালের সেই ছবিগুলোতে কলকাতাকে এক প্রকার “নরক” বা “মৃত্যুপুরী” হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
ফিল্মস ডিভিশন এই প্রোপাগান্ডাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ডকুমেন্টরিটি তৈরি করে। ছবির শুরুতেই প্রশ্ন তোলা হয়—”Is Calcutta really a doomed city?” এরপর তৎকালীন ‘কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’-র সচিবের জবানিতে দেখানো হয় কীভাবে ১৫০ কোটি টাকার একটি মেগা প্ল্যান নিয়ে শহরের পরিকাঠামো পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে।
এই তথ্যচিত্রটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এতে তৎকালীন কলকাতার পুঁজিপতি, বুদ্ধিজীবী, বামপন্থী কমিউনিস্ট এবং সাধারণ দৈনিক যাত্রীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। এই শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের ক্ষোভ, আশা এবং মিশ্র প্রতিক্রিয়া খুব চমৎকারভাবে ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল।
এসব প্রশ্ন শুনলে মনে হয় এ যেন আগ্নেয়গিরির তপ্ত লাভায় ঢেকে যাওয়া পম্পেই, সমুদ্রের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া কাল্পনিক আটলান্টিস কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসে পাপের ফলস্বরূপ ধ্বংস হওয়া সদোম ও গোমোরা। তেমনই কি আমাদের কলকাতা? যদিও কাল্পনিক, তবুও এই সব কাহিনির গভীরে লুকিয়ে আছে মানুষের চরম অহংকার, ক্ষমতার দম্ভ।
যখনই কোনো সভ্যতা বা শাসক নিজেকে অপরাজেয় মনে করেছে, ঠিক তখনই কোনো এক অদৃশ্য নিয়তি এসে তার দম্ভকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। তৃণমূলকে দেখুন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখুন। কলকাতাকে দেখুন।
সাহিত্য এবং দর্শনে এই ‘ডুমড সিটি’র ধারণাটি অত্যন্ত গভীর। বিখ্যাত সোভিয়েত সায়েন্স-ফিকশন লেখক স্ট্রুগাটস্কি ভাইদের একটি বিখ্যাত উপন্যাস আছে এই নামে, যেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে এক কৃত্রিম শহরের বুকে বিভিন্ন সময়ের মানুষকে এনে এক অদ্ভুত সামাজিক পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। সেই শহরের চারপাশটা ছিল শূন্যতায় ঘেরা, আর মাথার ওপর জ্বলত এক অদ্ভুত যান্ত্রিক সূর্য। এই রূপকের আড়ালে লেখকরা আসলে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, যখন কোনো সমাজ বা শাসনব্যবস্থা মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে এক কাল্পনিক ইউটোপিয়া বা স্বর্গরাজ্য গড়ার চেষ্টা করে, তখন সেই সমাজ ভেতর থেকে পচে নষ্ট হয়ে যায়। বাইরে থেকে তাকে চকচকে মনে হলেও, আসলে তা এক ধ্বংসোন্মুখ খাঁচায় পরিণত হয়।
প্রকৃতির মার হোক কিংবা মানুষের তৈরি যুদ্ধ আর পরমাণু অস্ত্রের হুমকি—একটা সাজানো-গোছানো শহর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে না। অতীতে যা ছিল রোম বা ব্যবিলনের ক্ষেত্রে, আজ আধুনিক যুগে জলবায়ু পরিবর্তন বা যুদ্ধের আবহে অনেক বড় বড় শহরের ক্ষেত্রেই সেই আশঙ্কা সত্যি হতে চলেছে। এই অভিশপ্ত শহরগুলোর ইতিহাস আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে, কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। পৃথিবীর বুকে মানুষের তৈরি সবচেয়ে মজবুত দেওয়ালটাও আসলে কতটা ভঙ্গুর, তা এই ধ্বংসের গল্পগুলো না পড়লে বোঝা যায় না।
আরও পড়ুনঃ হার্টের অসুখের ঝুঁকি কমায়, কমিয়ে দেয় ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকিও; আয়ু বাড়িয়ে দিতে পারে কফি
আমার মনে হয়, কংগ্রেস হল পশ্চিমবঙ্গের বুকে অভিশাপ। সত্তরের ভয়ানক দশা থেকে মুক্তি দিয়েছিল বামফ্রন্ট। আর এবারও তৃণমূল কংগ্রেসের হাত থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিজেপি। দুটোই অকংগ্রেসি দল। তবে বামফ্রন্টের পরিণতি কী হয়েছে দেখছেন তো?
বিজেপি কি রক্ষা করতে পারবে? কদিন বিজেপি থাকবে কেউ জানে না? বিজেপির অবস্থা বামফ্রন্টের থেকেও যেন খারাপ না হয়, এই শিক্ষা ইতিহাস থেকে নেবে তো?
যাই হোক, ১৯৭০ সালের সেই ‘ডুমড সিটি’ কলকাতা আর আজকের ২০২৬ সালের কলকাতার মধ্যে আপনি কী তফাত দেখতে পান? কলকাতা কি সত্যিই সেই অন্ধকার সময় কাটিয়ে উঠতে পেরেছে, নাকি সমস্যাগুলো শুধু রূপ বদলেছে? আপনার মূল্যবান মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান, শেয়ার করুন বিতর্ক চলুক


