বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, আঞ্চলিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রের বৈধতাকেও নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ কোনো নিছক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত ক্ষমতা-হস্তান্তরের অংশ, যেখানে তাকে আনুষ্ঠানিক পদত্যাগেরও সুযোগ দেওয়া হয়নি। সেনাপ্রধানের বক্তব্য—একটি সামরিক বিমানে বসিয়ে তাকে ভারতে পাঠানো হয়েছে—প্রমাণ করে যে এটি নির্বাসনের চেয়েও বেশি, রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর সহিংস পুনর্গঠন।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো—যে সামরিক-সমর্থিত, অনির্বাচিত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে জর্জরিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা দখল করেছে, সেই শাসনই এখন ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি তুলছে। অথচ সেনাবাহিনীই তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে, এবং দিল্লির সামনে বাস্তবিক কোনো বিকল্প খোলা রাখেনি। একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর ওপর এমন আচরণ আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক কূটনীতির ভাষায় স্পষ্টতই অসাংবিধানিক।
আন্তর্জাতিক আইন এই প্রশ্নে খুব সুস্পষ্ট। কোনো সামরিক-সমর্থিত বা অসাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকার পূর্ববর্তী নির্বাচিত সরকারের প্রধানকে প্রত্যর্পণ চাওয়ার বৈধতা অর্জন করে না। বিশেষত যখন সেই নেতা সেনাবাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপে ক্ষমতাচ্যুত এবং জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য হন। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোতে একে রাজনৈতিক নির্বাসন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে প্রত্যর্পণ করা মানে সরাসরি জীবনহানি বা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া।
আরও পড়ুনঃ অগ্নিমানবের প্রদীপ! এক অনল দেহের নিভে যাওয়া আগুন
এই প্রেক্ষাপটে আরও গুরুতর হলো আইসিটি-১–এর রায়, যেটি অনেকের মতে “আগে থেকেই লেখা” ছিল। যে বিচারে কোনও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছিল না, যেখানে আসামির আইনজীবীরা হয়রানির মুখে পড়েছেন, যেখানে বিচারকদের অতীত ও রাজনৈতিক আনুগত্য স্পষ্টভাবে পক্ষপাতপূর্ণ—সেই বিচারের রায়কে বিচারবৈধতার আলোকে দেখা কঠিন। পুরো প্রক্রিয়াটির নাটকীয়তা এতটাই অতিরঞ্জিত ছিল যে “ক্যাঙ্গারু কোর্ট” বলা হলেও তা যেন বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় কম কঠিন একটি মূল্যায়ন।

রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেখা গেল, আদালত আর ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের এক যান্ত্রিক প্রয়োগকারী। এখানে বিচারকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, জনমত প্রভাবিত করা এবং বিরোধী শক্তিকে স্থায়ীভাবে ক্ষতবিক্ষত করার কৌশল হিসেবে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে, এমন রায়কে বৈধতা দেওয়া যায় না; কারণ এর প্রক্রিয়া, উদ্দেশ্য ও সাংবিধানিক অবস্থান তিনটিই ত্রুটিপূর্ণ।
এই পুরো প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বৈধতার ভঙ্গুরতা প্রকাশ করছে। সেনাবাহিনী যে মুহূর্তে ক্ষমতা দখল করে, সেই মুহূর্ত থেকেই রাষ্ট্রের ওপর একটি অসাংবিধানিক শূন্যতা নেমে আসে। সেই শূন্যতাকে পূরণ করা হয়েছিল ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে—যারা নিজেই জনগণের ম্যান্ডেটহীন, রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট এবং মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে বিচার ও রাজনীতির সংঘর্ষ; আইসিটি-১–এর রায় এবং রাষ্ট্রীয় বৈধতার গভীর সংকট
এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কোনো আইনগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোকে ব্যবহৃত হয়েছে একটি প্রতীকী শাস্তি হিসেবে, যার লক্ষ্য তাকে এবং তার রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
বাংলাদেশ আজ যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কোনো একক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ক্ষমতার বৈধতা, বিচারিক নিরপেক্ষতা, সামরিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক আইনের সংঘর্ষের বহুমাত্রিক প্রতিফলন। এই সংকটের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, বিচারব্যবস্থার সংস্কার, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার ওপর।
বর্তমান বাস্তবতা বলছে—বাংলাদেশ শুধুমাত্র রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি ভিত্তির সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই পরিস্থিতির শেষ কোথায়, তা বলা কঠিন; তবে যে অন্ধকারের ভিতর দেশটি প্রবেশ করেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে রাষ্ট্রকে তার মৌলিক গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে ফিরে যেতে হবে।









