মঙ্গলবার বিকেল সওয়া ৩টের সময়ে কালীঘাটে তাঁর বাসভবন থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার আগে সম্ভাব্য প্রার্থীতালিকা নিয়ে এখন চরম উৎকণ্ঠা শুধু জোড়াফুল পরিবারে নয়, কৌতূহল রয়েছে রাজ্য রাজনীতিতেও। সবচেয়ে বড় আগ্রহ রয়েছে নন্দীগ্রামে তৃণমূলের সম্ভাব্য কাউন্টার মুভ নিয়ে। ভাবনীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। তার পর নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে স্থানীয় কোনও নেতাকে প্রার্থী করিয়েই তৃণমূল ক্ষান্ত থাকবে, সেটা অভিষেকের মেজাজের সঙ্গে যায় কি?
এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তার দু’ঘণ্টার মধ্যে কালীঘাটের বাসভবন থেকে প্রার্থী তালিকা পড়তে শুরু করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুতরাং অহেতুক আন্দাজের অবকাশ নেই। তবে হ্যাঁ, যেহেতু সম্ভাব্য তালিকা নিয়ে বিপুল আগ্রহ রয়েছে, তাই কিছু ধারণা দেওয়া যেতেই পারে।
তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা এবার খুব সহজ ছিল না। একটানা ১৫ বছর ধরে সরকার চলছে। তার ফলে সরকারের বিরুদ্ধে তো বটেই স্থানীয় স্তরে বহু বিধায়ক, মন্ত্রী, নেতার বিরুদ্ধেও চরম প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা রয়েছে। শহরাঞ্চলে তথা পুরসভা এলাকায় তা গ্রামের তুলনায় বেশি। সেই মোতাবেকই সমীক্ষা করে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে বসেন মমতা-অভিষেক ও আইপ্যাকের প্রতীক জৈন।
আরও পড়ুনঃ বড় ধাক্কা খেল ‘কর্পোরেট দল’ বিজেপি! এ কি হল?
যেমন হুগলির কথাই ধরা যাক। এই জেলায় বিধানসভার ১৮টি আসন রয়েছে। তার মধ্যে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি আসনে এবার প্রার্থী বদল করতে চলেছে তৃণমূল। পুরশুরা, খানাকুল, আরামবাগ, গোঘাট গত ভোটেই হেরেছিল তৃণমূল। ওই চার আসন ছাড়াও চুঁচুড়া, শ্রীরামপুর, চণ্ডিতলা, উত্তরপাড়া, বলাগড়ে প্রার্থী বদলের সম্ভাবনা আঠারো আনা। এমনকি সপ্তগ্রামে তপন দাশগুপ্ত ফের মনোনয়ন পাবেন কিনা সংশয় রয়েছে।
এখানেই জানিয়ে রাখা ভাল যে, উত্তরপাড়া আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য সঙ্গীত শিল্পী ইমন চক্রবর্তীকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একে তো প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দোলাচলে ছিলেন ইমন। তার উপর উত্তরপাড়ায় তাঁর কমরেড মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কোনওভাবেই প্রার্থী হতে চাননি ইমন। তবে তৃণমূল তাঁকে অন্য কোনও আসনে প্রার্থী করার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল বলেই খবর। হুগলি প্রসঙ্গে আরও একটা কথা না বললেই নয়। তা হলে চুঁচুড়া বিধানসভা আসনে দেবাংশু ভট্টাচার্যকে প্রার্থী করা হলেও হতে পারে। ওই আসনের জন্য আবার ফুটবলার বিদেশ বসুর কথাও ভেবে রাখা হয়েছিল। বিদেশ এখন উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক।
তৃণমূলের প্রবীণ বিধায়কদের অনেককেই বয়সের কারণে এবার প্রার্থী না করার কথাই ভাবা হয়েছিল। কিন্তু শেষমেশ বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বদল করতে গেলে এত বেশি দাবিদার হয়ে উঠছে যে তাতে বিড়ম্বনা বাড়ছে বই কমছে না। ফলে নির্মল ঘোষ, মদন মিত্ররা টিকিট পাবেন। রেশন দুর্নীতি কাণ্ডে অভিযুক্ত জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এবার আর হাবড়া বিধানসভা থেকে প্রার্থী হতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু কোনও অঘটন না ঘটলে জ্যোতিপ্রিয় ওরফে বালুকে হাবড়া থেকেই প্রার্থী করা হতে পারে।
এ ছাড়াও বেশ কিছু বিধায়ককে প্রার্থী করলেও তাঁদের আসন আশ্চর্যজনকভাবে বদলে যেতে পারে। যেমন পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডিপুরের বিধায়ক ছিলেন অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী। তাঁকে মেদিনীপুর তো নয়ই আশপাশের কোনও জেলাতেও টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। সোহমকে প্রার্থী করা হতে পারে নদিয়ার করিমপুর বিধানসভা আসনে।
এখন পড়ে রইলেন কিছু বিশিষ্ট নেতা বা মুখপাত্রের নাম। যেমন কুণাল ঘোষ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, অরূপ চক্রবর্তী, সুদীপ রাহা প্রমুখ। শেষ মুহূর্তে কোনও কৌশলের বদল না ঘটলে কুণাল ঘোষকে উত্তর কলকাতার একটি আসনে প্রার্থী করা হতে পারে। তা শশী পাঁজার বর্তমান আসন শ্যামপুকুর হলেও বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। কারণ শশী পাঁজার নাম এখনও ভোটার তালিকায় ওঠেনি। অ্যাডজুডিকেশনে রয়েছে।
বস্তুত উত্তর কলকাতায় চৌরঙ্গিতে নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাশীপুর বেলগাছিয়ায় অতীন ঘোষের আসন ছাড়া বাকি ৫ আসনে বর্তমান বিধায়কদেরও আসন অদলবদল হতে পারে। জোড়াসাঁকো আসনে বর্তমান বিধায়ক বিবেক গুপ্তর টিকিট পাওয়ার সম্ভবনা নেই বললেই চলে। বেলেঘাটা আসনে পরেশ পালকেও হয়তো আর প্রার্থী করা হবে না। এন্টালি আসনে স্বর্ণকমল সাহা বর্তমানে বিধায়ক। তাঁর শরীর খুব খারাপ। পরিবর্তে তাঁর ছেলে সন্দীপন সাহাকে সেখানে প্রার্থী করা হতে পারে। মানিকতলার বিধায়কর সুপ্তি পাণ্ডেকে আর প্রার্থী না করে তাঁর মেয়ে শ্রেয়া পাণ্ডেকে প্রার্থী করা হতে পারে। তবে শ্রেয়াকে মানিকতলাতেই প্রার্থী করা হবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই।
উত্তর কলকাতার কোনও একটি আসনে প্রার্থী করার জন্য ক্রিকেট প্রশাসক বিশ্বরূপ দে-র কথা ভাবা হয়েছে বলে খবর। বিশ্বরূপের নাম সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় সুপারিশ করেছেন বলে কালীঘাটের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি।
আরও পড়ুনঃ সিপিএমের একতরফা প্রার্থী ঘোষণায় শরিকি বিবাদ বামফ্রন্টে
একেবারে শেষে টলিপাড়ার প্রসঙ্গ না থাকলে অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। তবে টালিগঞ্জ থেকে যদি আদৌ কোনও নতুন মুখ আসে তা হতে পারেন কেবল পরম চট্টোপাধ্যায়। তাঁকে কোন আসনে প্রার্থী করা হবে, তা অবশ্য চরম গোপন রাখা হয়েছে।
বেহালা পূর্বে প্রার্থী করা হতে পারে শুভাশিসকে। বেহালা পশ্চিমে প্রার্থী করা হতে বেহালা পূর্বের বর্তমান বিধায়ক রত্না চট্টোপাধ্যায়কে।
একটা কথা না বললেই নয়। তৃণমূলের এবারের প্রার্থী তালিকায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অদলবদল চলেছে। তার চূড়ান্ত স্বরূপ কী দাঁড়িয়েছে তা স্পষ্ট হবে দু’ঘণ্টার মধ্যেই।







