মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মানেই বিশ্বজুড়ে মাতৃত্বকে কুর্নিশ জানানোর দিন। আজ মাদার্স ডে বা মাতৃদিবস। পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় আজ মায়েরা অভিনন্দিত হচ্ছেন। কিন্তু কেন এই বিশেষ দিনটির উদযাপন? কীভাবে শুরু হয়েছিল এই ঐতিহ্যের পথচলা? আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা ফিরে দেখব মাতৃদিবসের শিকড় ও এর রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
“মা” শব্দটি ছোট হলেও এর ব্যপ্তি অসীম। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারে যখন আমরা মা-কে শুভেচ্ছা জানাই, তখন তার পেছনে লুকিয়ে থাকে এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো এক সংগ্রামের ইতিহাস। আধুনিক মাতৃদিবসের প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানা জার্ভিস। তবে এই দিবসের বীজ বপন হয়েছিল আরও আগে।
আরও পড়ুনঃ মমতার জোট প্রস্তাবে ‘নো এন্ট্রি’ বোর্ড লাগিয়ে দিল সিপিএম
মাতৃদিবসের ধারণাটি আধুনিক মনে হলেও এর শিকড় প্রাচীন গ্রিস ও রোমে পাওয়া যায়। গ্রিকরা দেবতাদের মা ‘রিয়া’-র পূজা করত। আবার প্রাচীন রোমানরা ‘সাইবেলে’ নামক মাতৃদেবীর আরাধনা করত। ১৬শ শতাব্দীতে যুক্তরাজ্যে ‘মাদারিং সানডে’ পালিত হতো, যেখানে প্রথা ছিল যে সন্তানরা তাদের জন্মস্থানে গিয়ে মায়ের সাথে সময় কাটাবে এবং গির্জায় প্রার্থনা করবে।
আধুনিক মাতৃদিবসের প্রকৃত প্রবর্তক অ্যানা জার্ভিস। তাঁর মা, অ্যান মারিয়া রিভস জার্ভিস ছিলেন একজন সমাজকর্মী। তিনি গৃহযুদ্ধের সময় আহত সৈনিকদের সেবার জন্য ‘মাদার্স ডে ওয়ার্ক ক্লাব’ তৈরি করেছিলেন। ১৯০৫ সালে মায়ের মৃত্যুর পর অ্যানা জার্ভিস সংকল্প করেন যে, জীবিত বা মৃত সকল মায়েদের সম্মান জানাতে একটি নির্দিষ্ট দিন থাকা উচিত।
১৯০৮ সালে অ্যানা প্রথম পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের একটি গির্জায় তাঁর মায়ের স্মৃতিতে একটি স্মরণসভা আয়োজন করেন। সেই সভায় তিনি মায়েদের প্রিয় সাদা কার্নেশন ফুল বিতরণ করেছিলেন। এরপর থেকে তিনি মাতৃদিবসকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ব্যপক প্রচার শুরু করেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে সরকারিভাবে ‘মাতৃদিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন।
মজার বিষয় হলো, অ্যানা জার্ভিস চেয়েছিলেন এই দিনটি হবে একান্তই আবেগ ও শ্রদ্ধার। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যখন এই দিনটি কার্ড, ফুল এবং দামী উপহারের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তখন অ্যানা নিজেই এর প্রতিবাদ জানান। তিনি মনে করতেন, মাকে দেওয়ার সেরা উপহার হলো নিজের হাতে লেখা একটি চিঠি, কেনা কোনো দামী উপহার নয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন।
আরও পড়ুনঃ আদর্শের বিসর্জন নাকি ক্ষমতার সমীকরণ? বঙ্গ বিজেপিতে ‘বেনোজল’ আতঙ্ক!
বর্তমানে মাদার্স ডে একটি বৈশ্বিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। যদিও বিশ্বের সব দেশে একই দিনে এটি পালিত হয় না, তবে মূল উদ্দেশ্যটি একই—মাকে একটু আলাদাভাবে সময় দেওয়া এবং কৃতজ্ঞতা জানানো। প্রযুক্তির যুগে আমরা যখন যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছি, তখন এই একটি দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ আশ্রয়টি হলো মায়ের আঁচল।
মাদার্স ডে পালন করার জন্য কোনো বিশেষ ক্যালেন্ডারের প্রয়োজন হয় না, কারণ মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রতিদিনের। তবুও এই বিশেষ দিনটি আমাদের সুযোগ করে দেয় মা-কে জড়িয়ে ধরে একবার বলার জন্য—”মা, তুমি আছ বলেই আমি আছি।” ইতিহাসের পথ পেরিয়ে আসা এই দিনটি আজ প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত।


