Tuesday, 16 June, 2026
16 June
HomeকলকাতাMamata Banerjee: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, একজন ব্যাক্তি না কী একটি প্রোজেক্ট

Mamata Banerjee: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, একজন ব্যাক্তি না কী একটি প্রোজেক্ট

সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন, সিপিআই(এম) বিরোধিতা কি শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবেই বেশি কার্যকর ছিল, প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রকল্প হিসেবে নয়?

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

তমাল বোস, মুম্বাই:

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা বোঝা যায় না। তাঁকে দেখতে হবে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে, একটা প্রযেক্ট হিসেবে, যার লক্ষ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থাকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেওয়া এবং একটি দক্ষিনপন্থী রাজনৈতিক সমীকরণের নির্মাণ।

সত্তরের দশকে মমতা ব্যানার্জি জরুরি অবস্থার একজন কট্টর সমর্থক ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৮ এপ্রিল জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির বনেটে উঠে পড়া তরুণীটি দ্রুত জাতীয় রাজনীতির নজরে আসেন। কংগ্রেসের ভিতরে তাঁর উত্থান ছিল সংঘর্ষময় এবং প্রচারমুখী রাজনীতির এক বিরল উদাহরণ।১৯৮৪ সালে রাজীব গান্ধির বদান্যতায় ভোটের টিকিট,যাদবপুরে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারানো ইত্যাদি, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯৯৭ সালে। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বিশেষত সীতারাম কেশরির সঙ্গে সংঘাতের পর কার্যত দলছুট হয়ে পড়েন মমতা। সেই সংঘাতের ফলেই জন্ম নেয় তৃণমূল কংগ্রেস।

১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর তাঁর রাজনৈতিক প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটাই লক্ষ্য, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে সরানো। এর মদতে ব্যাক আপে ছিল অবশ্যই দক্ষিনপন্থী নানান দেশি বিদেশী শক্তি। মমতা যেন তাদের সেলস ম্যানেজার আর টার্গেট একটাই, বামফ্রন্ট হঠানো।

আরও পড়ুনঃ ধুতি, শার্ট আর রসায়ন

আর সেই লক্ষ্য পূরণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক বিস্তৃত সিপিআই(এম) বিরোধী পরিসর গড়ে তোলেন, যেখানে মতাদর্শগত বিরোধিতা প্রায়শই গৌণ হয়ে যায়। বিজেপির সঙ্গে জোট, এনডিএ সরকারে অংশগ্রহণ, সিঙ্গুর আন্দোলনের অনশন মঞ্চে রাজনাথ সিংয়ের উপস্থিতি, নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান, সংগঠন বিস্তারে মুকুল রায়ের ভূমিকা, অসম্ভব অর্থ খরচ, সবকিছু মিলিয়ে একটি বৃহৎ বামবিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি হয়।

একই সময়ে জঙ্গলমহলে কিষেণজির নেতৃত্বাধীন মাওবাদী প্রভাবও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে, একের পর এক সিপিআই(এম) কর্মীদের নিকেশ করার যজ্ঞ চলেছে। এই অংশে তার বোড়ে ছিল ছত্রধর মাহাতো। উত্তরবঙ্গে কামতাপুরি রাজনীতির বিভিন্ন অংশের সঙ্গেও তৃণমূল সময়ে সময়ে সমঝোতার পথ খুঁজেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করেন। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন শক্তিকে পাশে নিয়ে একটিই লক্ষ্য সামনে রাখা হয়েছিল, বামফ্রন্টকে পরাজিত করা।

রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি চলেছিল সাংস্কৃতিক লড়াইও। নিজেকে সাবঅল্টার্ণ প্রতিপন্ন করা থেকে শুরু করে প্রথিতযশা লেখক, শিল্পী, নাট্যব্যক্তিত্ব, অধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবী “পরিবর্তন”-এর পক্ষে অবস্থান নেওয়ানো। একটি নতুন বামবিরোধী নাগরিক সমাজ গড়ে তোলা, যারা দীর্ঘ বাম শাসনের সমালোচনাকে সাংস্কৃতিক বৈধতা দেয়। পরিবর্তনের ডাক শুধু রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে নয়, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজের ভেতর থেকেও উঠিয়ে আনা। কিন্তু ক্ষমতা পরিবর্তনের কয়েক বছরের মধ্যেই সেই বুদ্ধিজীবীদের এক বড় অংশের মোহভঙ্গ ঘটে। অনেকে প্রকাশ্যে সমালোচক হন, অনেকে দূরে সরে যান, আবার কেউ নীরবতা বেছে নেন।

২০১১ সালে “পরিবর্তন” এল। বাংলার মানুষ ভেবেছিল শুধু সরকার নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিও বদলাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল নিজেই একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামোয় পরিণত হতে থাকে। আন্দোলনের পুরনো কর্মী, সংগঠক ও সহযোদ্ধাদের গুরুত্ব কমে যায়। তাঁদের জায়গায় ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন তারকা প্রার্থী, সাংস্কৃতিক জগতের পরিচিত মুখ এবং ব্যক্তিগত আনুগত্যনির্ভর নেতৃত্ব, দলবদলু রাজনৈতিক মুখ এবং এক নতুন সাংস্কৃতিক বলয়, যেখানে সমালোচনার চেয়ে প্রশংসার মূল্য বেশি। একনায়কতান্ত্রিক দল ক্রমে আরও ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক বা পরিবারকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হল।

২০১২ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টন কলকাতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রশ্নটা বৈঠক হওয়া নয়, প্রশ্নটা হলো, কেন? পশ্চিমবঙ্গ তো কোনও স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। ভারতের বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করে দিল্লি। তাহলে মার্কিন কূটনীতির কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন কেন? কীসের ভিতিতে ২০১২ সালে এবং পরে ২০২১ সালেও তিনি TIME ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পান? এজেন্ডা সেই এক, বামফ্রন্ট হঠানো!

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তাঁর এই উত্থান কেবল বাম শক্তিকে ধ্বংস করার প্রয়োজনেই ছিল, এবং সেই দরকার তিনি সাধ্যমত চেষ্টা করেও সম্পূর্ণ করতে পারেননি। ক্ষমতায় আসার পর ১৫ বছর ধরে চলে সীমাহীন চুরি, লুঠপাট, এবং কয়েকটা প্রজন্মের ভবিষ্যৎ শেষ করে দেওয়া। সবকিছু দখল করে নেওয়া হয়, এবং তৃণমূল নিজেই একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামোয় পরিণত হতে থাকে, যেখানে আন্দোলনের পুরনো কর্মী ও সহযোদ্ধাদের গুরুত্ব কমে যায়।

আরও পড়ুনঃ মার্কিন মুলুকে দু’বার পিছিয়েও ড্র ইরানের, চমক সৌদির, মিসরের কাছে আটকে গেল বেলজিয়াম

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘ পনেরো বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পরও বামফ্রন্ট আমলের বিরুদ্ধে বড় কোনও দুর্নীতির অভিযোগকে বিচারিক পরিণতিতে পৌঁছে দেওয়া যায়নি। এর ফলে সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন, সিপিআই(এম) বিরোধিতা কি শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবেই বেশি কার্যকর ছিল, প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রকল্প হিসেবে নয়? কারন এতো সত্যই যে বামপন্থার সংগঠিত ভিত্তি অনেকটাই দুর্বল হওয়ার পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, তার বড় সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে বিজেপি, এবং যেটা প্রযেক্টই ছিল, বিজেপির মত দল বেশীদিন প্রক্সি দিয়ে খেলবেনা। পাশাপাশি দীর্ঘ ক্ষমতার ক্লান্তি, দুর্নীতির অভিযোগ, সাংগঠনিক ক্ষয়, নেতৃত্বের সংকট এবং দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ক্রমশ জমা হতে থাকে, যা তৃণমূলের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

অবশেষে ২০২৬ বিজেপির হাতে বাংলাকে তুলে দেওয়া, পাশাপাশি, ক্ষমতা হারানোর মাত্র এক মাসের মধ্যেই
যে দল তিনি নিজের হাতে গড়েছিলেন, যে দলকে তিনি নিজের ব্যক্তিত্বের সম্প্রসারণে পরিণত করেছিলেন, সেই দলের মধ্যেই দেখা দিলহ ভাঙন। একের পর এক নির্বাচিত প্রতিনিধি ও শীর্ষ নেতা বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিল। তৃণমূল কংগ্রেস বিভক্ত হল। এতটা হয়ত তিনি নিজেও ভাবতে পারেননি। সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের স্তম্ভ হয়ে থাকা বহু মানুষই শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা সমালোচকে পরিণত হন। বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারী আজকের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের হাত ধরে অনেকে নতুন দলে ঢুকে বিজেপিকে সাপোর্ট দিচ্ছে, সেদিনের ছেলে সিপিআই(এম) বহিষ্কৃত ঋতব্রত বিধায়কদের নিয়ে চম্পট দিয়েছে। পাশে সেই মদন কুনাল আর কে?

কিন্তু যে কারনে বাংলার মেয়ে, মমতা সততার প্রতীক, আরএসএস এর দুর্গার নির্মাণ, সেই কারন আজও রয়ে গেল, সিপিআই(এম) কে বঙ্গ রাজনীতি থেকে মুছে দেওয়া বা অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া তো দূরের কথা বরং আজ কাগজে কলমে না হলেও রাস্তার বাস্তবে দাঁড়িয়ে তারাই হয়ে রইল প্রধান বিরোধী। রেজিমেন্ট বনাম রেজিমেন্টের লড়াইয়ে পিষে গেল কে?

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন