অবশেষে নিট কেলেঙ্কারি ও নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে নতিস্বীকার করলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান । দীর্ঘ জল্পনা ও বিরোধীদের ধারাবাহিক দাবির মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিলেন তিনি।
পদত্যাগের পর ‘তরুণ বন্ধুদের’ জন্য দু’পাতার একটি খোলা চিঠি লিখে নিজের এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ধর্মেন্দ্র। চিঠিতে তিনি স্পষ্ট করেছেন— এটি তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিপত্তির বিষয় নয়। আন্দোলনকে হাতিয়ার করে রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি যাতে সুযোগ নিতে না পারে এবং পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ যাতে আইনি জটিলতায় আটকে না যায়, সেই কারণেই তিনি মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ সরকারের সঙ্গে ‘সেটিং’ করে অনশন ভেঙেছেন? এবার সততার প্রমাণ দিতে হবে সোনমকে!
চিঠির ছত্রে ছত্রে ধরা পড়েছে গত কয়েক দিনের ঘটনাক্রম নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বেদনা ও ক্ষোভ। যন্তর মন্তরের টানা বিক্ষোভ ও সার্বিক পরিস্থিতিকে ইঙ্গিত করে তিনি লেখেন, “গত ১০ দিনের ঘটনাক্রম দেখে আমার মন অত্যন্ত ব্যথিত। এটি আমার ব্যক্তিগত প্রতিপত্তির বিষয় নয়। ভারতমাতার যুবশক্তিই এই দেশের আসল শক্তি। যন্তর মন্তরে এবং দেশের অন্যান্য প্রান্তে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ যেন কোনও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি নিতে না পারে, দেশের ঐক্য যেন অটুট থাকে এবং আমাদের সন্তানরা যাতে আইনি জটিলতায় না জড়িয়ে পড়ালেখা ও ভবিষ্যতের দিকে মন দিতে পারে— এই সব দিক বিবেচনা করেই আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছি।”
ধর্মেন্দ্র আরও জানিয়েছেন, তরুণ সমাজকে কোনও বিভ্রান্তির চক্রব্যূহে ফাঁসে যেতে দেবেন না, এটাই তাঁর মূল সংকল্প। কারণ যুবসমাজ কেবল ভারতের ভবিষ্যৎ নয়, বরং নতুন ও উন্নত ভারতের মূল কারিগর।
আরও পড়ুনঃ তিন পুরুষ মনে রাখবে, ধর্মতলায় ছাত্র আন্দোলনের নামে ‘তাণ্ডব’; প্রয়োগ হল গুন্ডাদমন আইন
খোলা চিঠিতে ৩ মে-র নিট-ইউজি পরীক্ষার অনিয়ম থেকে শুরু করে সরকারের নেওয়া একের পর এক কড়া ব্যবস্থার খতিয়ান তুলে ধরেছেন সদ্যপ্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান,
সিবিআই তদন্ত ও পুনর্মূল্যায়ন: অনিয়ম প্রকাশ্যে আসামাত্রই কেন্দ্রীয় সরকার দ্রুত তা খতিয়ে দেখে তদন্তের দায়িত্ব সিবিআই-এর হাতে দেওয়া হয়। বাতিল করা পরীক্ষার পর গত ২১ জুন আবার সফল ভাবে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়।
আগামী বছর থেকে সিবিটি মোড: পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে আগামী বছর থেকে নিট পরীক্ষা পুরোপুরি সিবিটি (Computer-Based Test) বা কম্পিউটার ভিত্তিক মাধ্যমে আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফলাফল ও সাফল্য: গত ১৬ জুলাই নিট-এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, যা অত্যন্ত সন্তোষজনক এবং এতে দরিদ্র পরিবারের বহু মেধাবী পরীক্ষার্থী সফলতা অর্জন করেছেন।
তিনি দাবি করেন, প্রথম দিন থেকেই তিনি এই পরিস্থিতির সমস্ত নৈতিক দায় নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন এবং পরীক্ষা মাফিয়ার কারণে যাতে কোনও মেধাবী ছাত্রের সম্ভাবনা নষ্ট না হয়, তা সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। তবে এই প্রতিকূল সময়ে দায়িত্বশীল পদে বসে থাকা কিছু ব্যক্তি শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার ও বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ছাত্র, শিক্ষক ও শিক্ষা সংস্কারের কাজে যুক্ত থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ধর্মেন্দ্র লেখেন, “একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দূরদর্শী শিক্ষাব্যবস্থাই শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তিশিলা।” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্বের অধীনে রাষ্ট্রসেবা করার সুযোগ পাওয়ার জন্য চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার সহকর্মী, শিক্ষা মন্ত্রকের আধিকারিক ও কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানান। শেষে জগন্নাথ দেবের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে ভবিষ্যতেও ভারতমাতা, ওড়িশার জনগণ এবং দেশজুড়ে যুবসমাজের স্বপ্ন পূরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখার বার্তা দিয়ে ইস্তফার কথা জানান ধর্মেন্দ্র প্রধান।


