অনলাইন ডেস্ক:
পুরীর জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ পরম অমৃত সমান। এক চিমটে প্রসাদ পাওয়ার জন্য যেখানে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ভক্ত ব্যাকুল হয়ে থাকেন, সেখানে এমন একটি বিশেষ প্রসাদ রয়েছে যা সাধারণ মানুষের জন্য গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিষেধ! ভুলবশত তা খেলে অমঙ্গলের আশঙ্কাও করা হয়। কথা হচ্ছে শ্রীক্ষেত্রের অতি প্রাচীন ও অলৌকিক রীতি ‘অধরপানা’ নিয়ে।
কী এই ‘অধরপানা’? বাংলায় ‘অধর’ অর্থ ঠোঁট এবং ‘পানা’ অর্থ সুগন্ধি মিষ্টি শরবত। রথযাত্রার শেষে, সোনাবেশের পরদিন অর্থাৎ শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে এই বিশেষ অনুষ্ঠান পালিত হয়। শ্রীবিগ্রহের রথ ছেড়ে রত্নবেদীতে ফিরে যাওয়ার আগের সন্ধ্যায় রথের ওপর দেবদেবীর ঠোঁটের (অধর) উচ্চতা স্পর্শ করে থাকা বিশালাকার মাটির পাত্রে এই পানীয় নিবেদন করা হয় বলেই এর নাম ‘অধরপানা’।
পানা তৈরির অনন্য পদ্ধতি: সিংহদ্বারের কাছের প্রাচীন কুয়ো থেকে পবিত্র জল এনে দুধ, ছানা, পাকা কলা, চিনি, গুড়, সুগন্ধি কর্পূর, গোলমরিচ ও জায়ফল মিশিয়ে এই বিশেষ শরবত তৈরি করা হয়। বড় ওড়িয়া মঠ, রাঘব দাস মঠ এবং মন্দির প্রশাসনের জোগান দেওয়া উপকরণ দিয়ে তৈরি এই পানা ৩টি রথের ওপর মোট ৯টি লম্বা লাল মাটির পাত্রে রাখা হয়।
প্রসাদ বিলি না করে ভেঙে ফেলার রহস্য: পুজো ও আরতি শেষ হওয়ার পর সেবাইতরা এই সুগন্ধি পানীয় ভক্তদের মধ্যে বিলি করেন না, বরং ভরা মাটির পাত্রগুলোকে সশব্দে রথের ওপর ভেঙে ফেলা হয়। হাজার হাজার লিটার শরবত গড়িয়ে পড়ে রথের কাঠের ওপর দিয়ে।
আরও পড়ুনঃ সামাজিক বা আর্থিক চাপ! কৌতূহল বা নতুন অভিজ্ঞতা চেষ্টা করা; ভুল ধারণা ভেঙে সঠিক বোঝাপড়া
কেন এই নিয়ম? সনাতন ঐতিহ্য ও বিশ্বাস অনুযায়ী, নয় দিনের রথযাত্রায় মহাপ্রভুর রথ পাহারা দিতে এবং যাত্রা সফল করতে সঙ্গে চলেন অগণিত অদৃশ্য সত্তা, প্রেতাত্মা, চণ্ডী-চামুণ্ডা ও রক্ষক দেবদেবী। শ্রীমন্দিরে প্রবেশের আগে করুণাময় জগন্নাথদেব তাঁদের পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পানীয় নিবেদন করেন। রথের ওপর পাত্র ভেঙে দিলে সেই চুঁইয়ে পড়া পানীয় গ্রহণ করে অশরীরী আত্মারা তৃপ্ত হয় এবং মুক্তি লাভ করে।
মানুষের জন্য কেন নিষেধ? যেহেতু এই পানা সম্পূর্ণভাবে অশুভ শক্তি ও অশরীরী আত্মাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত, তাই শতাব্দী প্রাচীন নিয়ম মেনে কোনো ভক্ত বা মানুষকে এই প্রসাদ দেওয়া হয় না। লোকবিশ্বাস বলে, লোভে পড়ে বা ভুলবশত কোনো মানুষ এই গড়িয়ে পড়া পানা গ্রহণ করলে অশুভ শক্তির প্রভাবে মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতা বা প্রাণহানির ভয় থাকে।
জগন্নাথ সংস্কৃতির এই বিস্ময়কর রীতি আমাদের এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, দৃশ্যমান জগৎ ছাড়িয়ে চোখের আড়ালে থাকা সমস্ত সৃষ্টির প্রতিও মহাপ্রভুর করুণা সমানভাবে বর্ষিত হয়।


