বিশেষ সংবাদ প্রতিনিধি, পুরী:
পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গণের পশ্চিম দ্বারের সন্নিকটে অবস্থিত এক অত্যন্ত বিরল ও প্রাচীন বিগ্রহ—’ভাণ্ড গণেশ’ (যা ‘কাঞ্চী গণেশ’ নামেও সমধিক পরিচিত)। সাধারণ ভক্তদের কাছে শ্রীগণেশের শান্ত ও মঙ্গলময় রূপ পরিচিত হলেও, শ্রীমন্দিরের এই বিগ্রহটি খোদাই করা হয়েছে প্রাচীন ‘উচ্ছিষ্ট গাণপত্য’ সম্প্রদায়ের চরম বামমার্গীয় তন্ত্রশাস্ত্রের বিধানে।
বাহ্যিকভাবে প্রথাবিরোধী মনে হলেও উচ্চমার্গের শাক্ত ও গাণপত্য সাধকদের কাছে এই বিগ্রহ পরম চৈতন্য ও সৃষ্টির আদি কামশক্তির অদ্বৈত মিলনাত্মক এক জীবন্ত তান্ত্রিক প্রতীক।
আরও পড়ুনঃ প্রাচীন ফ্যাট-শেমিংয়ের এক অনন্য স্মারক; গণেশ চতুর্থীর রাতেই কেন ‘নষ্টচন্দ্র’?
বিগ্রহের গঠন ও তান্ত্রিক তাৎপর্য
শ্রীমন্দিরের এই বিশেষ গণেশ বিগ্রহের তান্ত্রিক রূপরেখা ও তাৎপর্য নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় ও ক্ষেত্র | বিগ্রহের বিবরণ ও তান্ত্রিক তত্ত্ব |
| বিগ্রহের নাম | ভাণ্ড গণেশ / কাঞ্চী গণেশ। |
| আগমনের ধারা | ‘উচ্ছিষ্ট গাণপত্য’ বামমার্গীয় শাক্ত ও তান্ত্রিক ধারা। |
| মূর্তিতত্ত্ব (Iconography) | বিগ্রহের বাম ঊরুর ওপর অন্তর্নিহিত মহাশক্তি নগ্নিকা রূপে উপবিষ্টা এবং গণপতির শুঁড় দেবীর যোনিদেশ স্পর্শ করে রয়েছে। |
| আধ্যাত্মিক অর্থ | শাক্ত ও গাণপত্য তন্ত্র মতে এটি অহং বিনাশ এবং শিব-শক্তির অদ্বৈত পরমানন্দের নির্দেশক। |
কাঞ্চী অভিযান ও গজপতি পুরুষোত্তম দেবের অপমান
এই বিগ্রহের পুরীতে আগমনের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে পঞ্চদশ শতকের ওড়িশার ইতিহাস ও ‘মাদল পাঁজি’-তে লিখিত কাঞ্চী অভিযান।
-
‘ছেড়া পহরা’ ও রাজকীয় দ্বন্দ্ব: পুরীর গজপতি রাজা পুরুষোত্তম দেব কাঞ্চীর রাজকুমারী পদ্মাবতীর পাণিপ্রার্থনা করেন। তবে রথযাত্রায় শ্রীজগন্নাথের রথের সামনে রাজাকে সোনার ঝাঁটা দিয়ে পথ পরিষ্কার (‘ছেড়া পহরা’) করতে দেখে কাঞ্চীরাজ তাঁকে উপহাস করেন এবং বিবাহ প্রস্তাব নাকচ করে দেন।
-
প্রথম যুদ্ধে পরাজয়: অপমানিত গজপতি কাঞ্চী আক্রমণ করলেও কাঞ্চীরাজের কুলদেবতা এই জাগ্রত তান্ত্রিক গণেশের দৈব সুরক্ষার কারণে প্রথম অভিযানে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।
আরও পড়ুনঃ অগ্নিগর্ভ মণিপুর, কুকি জনগোষ্ঠীর ৪ জনকে নৃশংস হত্যা
মানিক গৌড়িনী ও মহাসংগ্রামের পৌরাণিক জয়
প্রথম যুদ্ধের পরাজয়ের পর রাজা পুরুষোত্তম দেব শ্রীজগন্নাথের শরণাপন্ন হন। লোকগাথা অনুযায়ী, ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে শ্রীজগন্নাথ শ্বেত অশ্বে এবং শ্রীবলভদ্র শ্যামল অশ্বে কাঞ্চীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে চিল্কা হ্রদের তীরে গোয়ালিনী মাণিকার কাছ থেকে দই খেয়ে রত্নখচিত আংটি দেওয়ার ইতিহাস আজও ওড়িশার লোকসংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ।
রণক্ষেত্রে স্বয়ং জগন্নাথ ও বলভদ্রের উপস্থিতি টের পেয়ে তান্ত্রিক গণেশ কাঞ্চীর ওপর থেকে দৈব সুরক্ষা প্রত্যাহার করে নেন। ফলে যুদ্ধে কাঞ্চীরাজ পরাস্ত হন। বিজয়ী গজপতি পুরুষোত্তম দেব রাজকুমারী পদ্মাবতীকে পুরীতে নিয়ে আসার পাশাপাশি যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ জয়স্মারক হিসেবে কাঞ্চীর এই শক্তিশালী তান্ত্রিক গণেশকে শ্রীমন্দিরে এনে প্রতিষ্ঠা করেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শ্রীমন্দিরের প্রাঙ্গণে এই ভাণ্ড গণেশ ওড়িশার বীরত্ব, ভক্তি ও তন্ত্র সাধনার এক ঐতিহাসিক স্তম্ভ হয়ে বিরাজ করছে।


