কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত ভূখণ্ড ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) সংলগ্ন উত্তরবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশের সময় এক চিনা নাগরিককে আটক করলেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ও সশস্ত্র সীমা বলের (SSB) যৌথ বাহিনী। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখানোর নাম করে ওই চিনা নাগরিককে নেপালি সাজিয়ে ভারতীয় সীমানায় নিয়ে আসার অভিযোগে তাঁর এক নেপালি গাইডকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে গোয়েন্দাদের অনুমান, এই অনুপ্রবেশ নিছক পর্যটনের উদ্দেশ্যে ছিল না; বরং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সীমান্ত অঞ্চলে সামরিক গতিবিধির উপর নজরদারি চালাতে বা চরবৃত্তি করার উদ্দেশ্যেই এই চিল সংবেদনশীল চক্রান্ত রচিত হয়েছিল।
আরও পড়ুনঃ আইএসআই-কে গোপন তথ্য পাচার! হাসিমারা থেকে গ্রেফতার ভারতীয় সেনার জওয়ান
কীভাবে ধরা পড়ল চিনা নাগরিক ও তাঁর গাইড?
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ধৃত চিনা নাগরিকের নাম ইউহাস লিউ (Yuhas Liu)। তিনি সম্প্রতি চিন থেকে নেপালে পৌঁছান এবং সেখানে নেপালি গাইড দীনেশ পুরির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়।
-
গভীর রাতে অনুপ্রবেশ: শুক্রবার ভোররাতে নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় টহলরত এসএসবি (SSB) জওয়ানদের নজরে পড়েন ওই দুই ব্যক্তি।
-
ভাঙা ইংরেজি ও ভুয়া পরিচয়: এসএসবি ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের যৌথ জেরায় দীনেশ ও লিউ নিজেদের নেপালি নাগরিক বলে দাবি করেন। কিন্তু গোয়েন্দারা লক্ষ্য করেন যে, লিউ নেপালি বা হিন্দি তো দূরে থাক, ভাঙা ইংরেজি ছাড়া কিছুই বলতে পারছেন না।
-
দোভাষীর সাহায্য ও আসল সত্যের উদ্ঘাটন: এরপর দোভাষী এনে দীর্ঘক্ষণ জেরা করার পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তিনি আদতে চিন দেশের নাগরিক। সঙ্গে সঙ্গেই দু’জনকে আটক করা হয়।
কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তোলার অজুহাত ও গোয়েন্দাদের সন্দেহ
জিজ্ঞাসাবাদের মুখে নেপালি গাইড দীনেশ দাবি করেন যে, ইউহাস লিউ বিভিন্ন জায়গা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বত দেখার ও ছবি তোলার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। সেই কারণেই সীমান্ত পার করিয়ে তাঁকে ভারতীয় অংশে নিয়ে আসা হচ্ছিল।
তবে গাইডের এই সাফাই মেনে নিচ্ছেন না গোয়েন্দারা। তাঁদের জোরালো সন্দেহ—কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার নাম করে মূলত শিলিগুড়ি করিডোরের সংবেদনশীল সামরিক ঘাঁটির ছবি সংগ্রহ, চরবৃত্তি বা স্থানীয় কোনো সহযোগীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্যই এই অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছিল। ধৃতদের মোবাইল ফোন, পরিচয়পত্র ও ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বাজোপ্ত করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে তাঁরা কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরিকল্পনা করেছিলেন।
আরও পড়ুনঃ কলকাতায় ৭০-৮০ টাকা কেজিতে বিকোচ্ছে পেঁয়াজ, ছ্যাঁকা দিচ্ছে ভোজ্য তেল, মাথায় হাত মধ্যবিত্তের
‘চিকেনস নেক’ করিডোরের কৌশলগত গুরুত্ব ও সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
উত্তরবঙ্গের এই সংকীর্ণ ‘চিকেনস নেক’ করিডোর বা শিলিগুড়ি করিডোর ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করেছে। ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে এই এলাকার নিরাপত্তা অত্যন্ত সংবেদনশীল।
-
আধুনিক নজরদারি: সাম্প্রতিক অতীতে এই এলাকার আকাশসীমা ও ভূ-প্রাকৃতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকার একাধিক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। রুশ প্রযুক্তির এস-৪০০ (S-400) ডিফেন্স সিস্টেমের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে ইজরায়েলি প্রযুক্তির অত্যাধুনিক ‘অ্যারোস্ট্যাট রাডার’ (Aerostat Radar)।
-
পাহাড়ি ভূখণ্ডের প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে আকাশের বহু উঁচুতে বেলুনের মতো ভেসে থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত নিখুঁত নজরদারি চালাতে সক্ষম এই ৩-ডি রাডার। শত্রুর ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল বা যুদ্ধবিমানের যেকোনো গতিবিধি এটি সহজেই ধরে ফেলতে পারে।
এমনকি এই ধরনের দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষার মাঝেই চিনা নাগরিকের এই সন্দেহজনক অনুপ্রবেশ এবং গ্রেফতারির ঘটনা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়ে জেরা চালিয়ে এই আন্তর্জাতিক গুপ্তচর চক্রের গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা।


