চন্দন দাস, (বিশেষ সম্পাদকীয় নিখন):
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। প্রাইমারি স্কুলের ফোর ক্লাসে তখন প্রতিদিনের চেনা ছন্দ। কলকাতার শিয়ালদার টাকি হাউসে রক্তিমাদির পড়ানোর মাঝে বড়দির (হেড ম্যাম) আচমকা প্রবেশ, অফিস ঘরের ফিসফাস, নিখিলদার ছুটির ঘণ্টা আর কচিকাঁচাদের আগাম ছুটির সেই চিরপরিচিত অনাবিল আনন্দ—একটি মাত্র সংবাদের ধাক্কায় কীভাবে যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো দেশটা।
রাজনৈতিক জটিলতা কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যাকাণ্ডের গভীরতা বোঝার মতো বয়স তখন ছিল না। কিন্তু বন্দনাদি, রক্তিমাদি, সঞ্চিতাদিদের থমথমে মুখের জটলা বুঝিয়ে দিয়েছিল, কোনো এক অস্বাভাবিক ঝড় নেমে এসেছে।
রেডিওর সামনে থমকে যাওয়া সময় ও ঝন্টু-নিতাইদের বার্তা
স্কুল থেকে বাড়িতে ( শিয়ালদা থেকে হেদুয়া) ফিরে দেখা গিয়েছিল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ঠাকুমা, মা, কাকু—পরিবারের সবাই নিঃশব্দে ঘিরে বসে আছেন মারফি বা ফিলিপসের সেই কাঠের ফ্রেমের রেডিওটিকে। পাড়ার জগদ্ধাত্রী পুজার মণ্ডপে মাইকের আওয়াজ কেমন যেন চুপ করে গেছে।
-
খেলার মাঠের নীরবতা: বড়দের গম্ভীর পরিবেশ এড়িয়ে যখন স্বভাবসিদ্ধ আনন্দে বন্ধুদের সাথে স্কুলের মাঠে খেলাধুলোর উদ্দেশ্যে ছুটে যাওয়া হলো, সেখানেও ধাক্কা। পাড়ার দাদারা তার মধ্যে বিশেষ করে চন্দনিদাদাভাই, বেঁটে দাদা জানিয়ে দিল—“আজ খেলা হবে না, দেশের প্রধানমন্ত্রী মারা গিয়েছেন।”
-
সেই রাতের রেডিও ও নতুন পাঠ: বালক বয়সে প্রধানমন্ত্রী হারানোর বিষাদ ছোঁয়ার চেয়েও খেলা বন্ধের ধাক্কাটাই ছিল প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু রাতে ঠাকুর্দার কাছে গল্পের মতো করে শোনো ইন্দিরা গান্ধীর কথা, রেডিওর অল ইন্ডিয়া রেডিওর বিশেষ বুলেটিন আর পাড়ার মোড়ে মোড়ে গম্ভীর আনাগোনা ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিল শতাব্দীর অন্যতম বড় বিপর্যয় ঘটে গিয়েছে।
‘কালো হাত’ থেকে রাজীব-মুজিব-বেনজীর: উপমহাদেশীয় রাজনীতির রক্তাঙ্কিত অধ্যায়
প্রয়াণের আগে যাঁকে ঘিরে শুধু রাজনৈতিক দেওয়াল লিখন বা ‘কালো হাত ভাঙো গুঁড়িয়ে দাও’ জাতীয় দেওয়াল-স্লোগান চোখে পড়ত, তাঁর প্রয়াণের পরেই যেন ইন্দিরা গান্ধীকে নতুন করে আবিষ্কার করা। ইন্দিরা গান্ধীর এই সশস্ত্রে প্রয়াণ যেন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক অভিশপ্ত ঐতিহ্যের সূচনা করেছিল।
-
পরবর্তী আঘাত: ইন্দিরা প্রয়াণের পর রাজীব গান্ধীর ক্ষমতায় আসা এবং কয়েক বছরের ব্যবধানে শ্রীপেরুমবুদুরে তাঁরও একইভাবে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া। আমি তখন দার্জিলিঙের পাহাড়ে। চারিদিক শুনশান।
-
উপমহাদেশীয় ট্র্যাজেডি: বাংলাদেশের বুকে শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেনজীর ভুট্টোর ঘাতকদের গুলিতে মৃত্যু, এমনকি পরবর্তীতে নেপালের রাজপরিবারের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড—একটি বিশেষ সময়ে সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাস প্রায় গেঁথে গিয়েছিল যে, ভারতীয় উপমহাদেশে রাষ্ট্রপ্রধানদের হত্যাকাণ্ড বুঝি এক নিষ্ঠুর স্বাভাবিকতা!
উপসংহার
৩১ অক্টোবরের সেই অকাল ছুটি পাওয়া শৈশব আজ চার দশক পেরিয়ে এক অমূল্য ইতিহাসের দলিল। একজন ফাইভের ছাত্রের কাছে যে দিনটি শুরু হয়েছিল কেবল আগাম স্কুল ছুটির আনন্দ নিয়ে, দিনশেষে তা শেষ হয়েছিল দেশের এক মহাসন্ধিক্ষণের প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে। ইন্দিরা গান্ধীর ৪২তম প্রয়াণদিবসে এমন সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতিকথাই আসলে প্রমাণ করে—ইতিহাস কীভাবে নিঃশব্দে গেঁথে যায় সাধারণের আটপৌরে স্মৃতিতে।


