বিশেষ রাজ্য ও রাজনৈতিক সাক্ষাৎকার ভিত্তিক প্রতিবেদন:
ভিভিআইপি পরিবারের সন্তান হওয়ার চাপ, কমিউনিস্ট পার্টির অন্দরে মতানৈক্য, এসএফআইয়ের ‘দাদাগিরি’ থেকে শুরু করে বাবার অধরা শিল্পায়ন স্বপ্ন—এতদিন ক্যামেরার আলো থেকে দূরে থাকা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর পুত্র সুচেতন ভট্টাচার্য (Suchetan Bhattacharjee) এবার সংবাদমাধ্যমের সামনে সম্পূর্ণ খোলামেলাভাবে নিজের মনের কথা প্রকাশ করলেন। ছাত্র রাজনীতি ও সিপিএমের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেওয়ার পাশাপাশি, তিনি রাজ্যের বর্তমান শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের শিল্পায়নের উদ্যোগের ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন।
১. এসএফআইয়ের ‘ডিক্টেশন’ ও বাম শিবিরের দ্বিচারিতায় অনীহা
পরিবারের রাজনৈতিক ট্র্যাডিশন মেনে প্রেসিডেন্সি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন সুচেতন। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখের হয়নি।
-
ব্যক্তি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ: সাক্ষাৎকারে সুচেতন স্পষ্ট জানিয়েছেন, এসএফআই একটা সময়ে কে কী বই পড়বে, কার সঙ্গে মিশবে বা কথা বলবে—সেসব বিষয়েও নির্দেশিকা বা ‘ডিক্টেট’ করত। ব্যক্তি-স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হওয়ায় তিনি এই জোরজুলুম মেনে নিতে পারেননি। দলের ‘সবাই এক বুলি আওড়াবে’ এই মানসিকতায় বিতৃষ্ণা এসে যাওয়ায় তিনি এসএফআই ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। যদিও তাঁর বাবা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কখনই তাঁকে কোনো কিছু জোর করেননি, বরং সবসময় নিজের ইচ্ছামতো চলার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।
-
বাম নেতাদের ভণ্ডামি ও দ্বিচারিতা: সিপিএমের কিছু নেতার আচার-আচরণ নিয়ে চরম বিরক্তি প্রকাশ করে সুচেতন বলেন, কিছু ‘টিপিক্যাল’ বামপন্থী রাজনীতিবিদ নিজেদের সর্বহারা সাজাতে গিয়ে লোকদেখানো ভেক ধরেন—যেমন সিগারেট খাওয়ার টাকা নেই বলে বিড়ি খাওয়া। অথচ আড়ালে নিজেরা সন্তানদের বিদেশে পড়তে পাঠানো বা প্রচুর সম্পত্তির মালিক হওয়ার মতো দ্বিচারিতা করেন। এই ভণ্ডামি তাঁর একেবারেই পছন্দ ছিল না।
আরও পড়ুনঃ ‘হাতে আর সময় নেই; মে ডে, মে ডে’; গগনভেদী আর্তনাদ! মুহূর্তেই ৩৫ ফুট উচ্চতা থেকে রাস্তায় আছড়ে পড়ল বিমান
২. সিঙ্গুরে শিল্প নিয়ে বাবার অবসাদ ও বর্তমান সরকারের ওপর আস্থা
প্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ছিল সিঙ্গুরে শিল্প না হওয়া। এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সুচেতনের গলায় কষ্টের সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
-
বাবার মানসিক অবসাদ: সুচেতন জানান, জীবনের শেষদিনগুলোতে কেবল এই একটাই আক্ষেপ বুদ্ধদেববাবুকে মানসিকভাবে গ্রাস করেছিল এবং তিনি রাজনৈতিক কথাবার্তাও বলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
-
শুভেন্দু সরকারের ওপর ভরসা: বর্তমান সরকার যেভাবে শিল্পস্থাপনে অত্যন্ত সদর্থক ও ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা দেখে বুদ্ধবাবু নিশ্চয়ই খুব খুশি হতেন বলে মন্তব্য করেছেন সুচেতন। এর আগে বুদ্ধপত্নী মীরা ভট্টাচার্যও সিঙ্গুরে শিল্প নিয়ে বর্তমান সরকারের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছিলেন। বুদ্ধদেবপুত্রও সেই একই সুর ধরে মনে করছেন, অতীতে যা বাধা পেয়েছিল, বর্তমান সরকারের হাত ধরে তা বাস্তবায়িত হওয়াই উচিত।
তৃণমূল জমানার সমালোচনা এবং সিপিএমের অভ্যন্তরীণ গঠনতন্ত্র ও কট্টরপন্থী রাজনীতির কড়া সমালোচনা করে সুচেতনের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


