বিশেষ প্রতিনিধি:
মঞ্চে উঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘দেশভক্তি’, ‘স্বদেশী চেতনা’ কিংবা ‘স্বনির্ভর ভারত’-এর স্বপক্ষে জ্বালাময় ভাষণ। দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান নিয়ে বড় বড় দাবি করলেও, বাস্তবে দেশের শীর্ষ রাজনীতিকদের বড় অংশের সন্তানরাই কেন পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য পাড়ি দিচ্ছেন আমেরিকা, ব্রিটেন কিংবা ইউরোপে? নেতাদের মুখাবয়বের এই দ্বিমুখী আচরণ ও নীতিবাক্যের বিপরীত সামাজিক চিত্র নিয়ে এবার কেবল সাধারণ মানুষ নয়, সোচ্চার হচ্ছেন দলীয় সমর্থকরাও। প্রমাণ হিসেবে উঠে আসছে বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতার সন্তানদের বিদেশমুখী জীবনের উদাহরণ।
আরও পড়ুনঃ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠার হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর
প্রমাণ ও তথ্যের চিত্রমালা: মুখে দেশীয় শিক্ষা, পরিবারে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়
রাজনীতির ময়দানে একপক্ষ অন্যপক্ষকে আক্রমণ করলেও, সন্তানদের বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রায় সমস্ত বড় রাজনৈতিক শিবিরের ছবিটাই এক।
-
অমিত শাহ ও জয় শাহ: বিজেপির জাতীয়তাবাদী ভাবধারার মূল কাণ্ডারী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দেশের যুব সমাজকে ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ ও দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়ার আহ্বান জানান। তবে তাঁর পুত্র, বিসিসিআই (BCCI) সচিব জয় শাহ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ক্রীড়া পরিচালনায় যুক্ত।
-
রাজনাত সিং ও নীরাজ সিং: প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং স্বদেশী জ্ঞানচর্চা ও ভারতীয় পরিকাঠামো নিয়ে নিয়মিত সোচ্চার হলেও, তাঁর এক ছেলে বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্পোরেট জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
-
রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী (গান্ধী পরিবার): কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বও এর ব্যতিক্রম নন। উত্তরসূরি হিসেবে রাজনীতিতে আসার আগে রাহুল গান্ধী যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের রোলিন্স কলেজে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সন্তানরাও যুক্তরাজ্যের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন।
-
পি চিদম্বরম ও কার্তি চিদম্বরম: সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরমের পুত্র কার্তি চিদম্বরম যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় ও কেমব্রিজের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন।
-
আখিলেশ যাদব ও তেজস্বী যাদব (আঞ্চলিক শক্তি): উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টির প্রধান আখিলেশ যাদব অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ প্রকৌশল নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। একইভাবে বহু আঞ্চলিক দলের নেতার দ্বিতীয় প্রজন্ম দেশীয় পরিকাঠামোর বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়েছেন।
আরও পড়ুনঃ ১০ কোটিতে ভোলবদল! আদানির উদ্যোগে নতুন রূপে সেজে উঠছে ঐতিহাসিক কুমোরটুলি ঘাট
সমর্থক ও আমজনতার তীব্র প্রতিক্রিয়া: ক্ষোভ কোথায়?
নেতাদের এই দ্বিমুখী ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও তৃণমূল স্তরের রাজনৈতিক কর্মীদের মনে নানা প্রশ্ন দানা বাঁধছে:
-
শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাসের অভাব: নেতারা যখন সরকারি বা দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের বড়াই করেন, তখন তাঁদের নিজেদের পরিবারের তরুণ প্রজন্ম ভারতীয় আইআইটি, আইআইএম বা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে কেন হাভার্ড, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বেছে নিচ্ছেন? এতে কি প্রমাণিত হয় না যে নেতারা নিজেরাই দেশের ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন না?
-
সাধারণ বনাম ভিআইপি বৈষম্য: সাধারণ পরিবারের সন্তানদের জন্য ‘দেশপ্রেম’-এর কথা বলে সীমিত সুযোগে সন্তুষ্ট থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়, অথচ ভিআইপিদের সন্তানেরা বিশ্বজনীন সুবিধা নিয়ে ক্যারিয়ার তৈরি করছেন।
-
ভণ্ডামির রাজনীতি: দেশীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সুর চড়ালেও ব্যক্তিগত জীবনে পশ্চিমা জীবনধারা ও আন্তর্জাতিক ডিগ্রি বেছে নেওয়াকে ‘রাজনৈতিক ভণ্ডামি’ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
নেতাদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও বাস্তবতার তর্ক
বিতর্কের মুখে নেতারা অবশ্য একে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলে বর্ণনা করেন। তাঁদের মতে, রাজনীতি তাঁদের পেশা হলেও সন্তানদের নিজস্ব যোগ্যতা ও ইচ্ছেমতো বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পড়াশোনা বা চাকরি করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক ডিগ্রি বা অভিজ্ঞতা অর্জন কোনো অপরাধ নয়।
তবে সাধারণ মানুষের যুক্তি—রাজনীতিকরা আর পাঁচজন সাধারণ নাগরিকের মতো নন, তাঁরা সমাজের পথপ্রদর্শক। তাঁদের কথা ও কাজের মিল থাকাটাই সুস্থ রাজনীতির প্রাথমিক শর্ত। মুখে দেশভক্তির স্লোগান দিয়ে পরিবারকে বিদেশমুখী করার এই প্রবণতা আগামী দিনে সাধারণ ভোটারদের আস্থা আরও কমাবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।


