অনলাইন ডেস্ক:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যুগে ইন্টারনেটে দিন দিন মানুষের লেখা নিবন্ধের চেয়ে এআই-জেনারেটেড লেখার আধিক্য বাড়ছে। ফলে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কাছে এখন সবচেয়ে মূল্যবান ও নির্ভরযোগ্য ডেটাসেট হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপ্লব শুরুর আগের (বিশেষ করে ২০২২ সালের পূর্ববর্তী) মানুষের লেখা মুদ্রিত বই। প্রাক-এআই যুগের মানব-লিখিত ও সম্পাদিত বই সংগ্রহ করা, দ্রুত স্ক্যানিংয়ের জন্য বাঁধাই কেটে ফেলা এবং কপিরাইট লঙ্ঘন সংক্রান্ত বড়সড় এক আইনি লড়াইয়ের পর জুলাই ২০২৬-এ মার্কিন আদালতে এক ঐতিহাসিক ১.৫ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সমঝোতা অনুমোদিত হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ তাজ্জব সবাই! মাঝরাতেই অতর্কিতে মেগা অপারেশন
কেন হঠাৎ প্রাক-এআই যুগের বইয়ের এত চাহিদা? আজকের ইন্টারনেটে বিপুল পরিমাণে এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট যুক্ত হওয়ায় ডেটার গুণগত মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। সাধারণ ওয়েবসাইটের তুলনায় এআই-পূর্ব যুগের মুদ্রিত বইগুলির ভাষা, তথ্যের সঠিকতা ও সম্পাদনার মান অত্যন্ত সুসংগঠিত। প্রাক-এআই যুগের লেখায় এআই-এর তৈরি লেখার মিশ্রণ থাকার সম্ভাবনা শূন্য। তাই ভবিষ্যতের উন্নত এআই মডেল প্রশিক্ষণে ভুল কমাতে এবং তথ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি প্রাক-এআই যুগের বইকে ‘উচ্চমানের প্রশিক্ষণ ডেটা’ হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
বই ধ্বংস ও ডিজিটাইজেশনের বিতর্কিত পদ্ধতি: ডেটা সরবরাহকারী ও সংগ্রহকারী সংস্থাগুলি (যেমন ISBNDB) বিপুল পরিমাণে পুরোনো বই কিনে হাই-স্পিড স্ক্যানার দিয়ে স্ক্যান করার পর ‘অপ্টিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন’ (OCR) প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলিকে ডিজিটাল টেক্সটে রূপান্তর করছে। তবে বিতর্কের বিষয় হলো, দ্রুত স্ক্যান করার স্বার্থে স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানারে দেওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই বিরল ও সংগ্রহযোগ্য বইয়ের বাঁধাই কেটে আলাদা করে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে মূল মুদ্রিত বইটি চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা বই সংগ্রাহক ও গ্রন্থাগারিকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অ্যানথ্রপিক মামলা ও ‘ফেয়ার ইউজ’ বিতর্ক: এই কপিরাইট ও ডিজিটাইজেশন বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে জনপ্রিয় এআই সংস্থা ‘অ্যানথ্রপিক’ (Anthropic)। আদালতের নথিতে জানা যায়, সংস্থাটি লক্ষ লক্ষ মুদ্রিত বই সংগ্রহের পাশাপাশি গতি বাড়ানোর জন্য বাঁধাই কেটে স্ক্যান করেছিল। একইসঙ্গে তাদের সংগ্রহে বিপুল পরিমাণ কপিরাইট-সুরক্ষিত বইয়ের অননুমোদিত ডিজিটাল কপি ছিল।
মামলায় বিচারক পর্যবেক্ষণ করেন, আইনি উপায়ে কেনা বই স্ক্যান করে এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার নির্দিষ্ট শর্তে ‘ফেয়ার ইউজ’ (Fair Use) হতে পারে, কিন্তু অনুমতি ছাড়া কপিরাইট-সুরক্ষিত বইয়ের অননুমোদিত ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ বা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও কপিরাইট লঙ্ঘন।
আরও পড়ুনঃ ইংরেজদের অহংকারে এক বিশাল আঘাত; পরাধীন ভারতের বুকে খালি পায়ে ফুটবল বিপ্লবের অমর ইতিহাস
জুলাই ২০২৬-এর ঐতিহাসিক সমঝোতা ও ক্ষতিপূরণ: জুলাই ২০২৬-এ মার্কিন আদালত এআই প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কপিরাইট বিরোধে এযাবৎকালের বৃহত্তম ১.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আর্থিক সমঝোতায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। যোগ্য বইগুলির ৯১ শতাংশেরও বেশি ইতিমধ্যেই এই দাবির আওতায় এসেছে।
-
ব্লুমসবারির প্রাপ্তি: আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ব্লুমসবারি (Bloomsbury) জানিয়েছে, তাদের ১৪,০৮৭টি বই এই সমঝোতার আওতাভুক্ত। প্রতিটি বইয়ের শিরোনামের জন্য গড়ে প্রায় ৩,০০০ ডলার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে (যা লেখক ও প্রকাশকের মধ্যে বণ্টন হবে)। সব মিলিয়ে ব্লুমসবারি পেতে চলেছে প্রায় ১৪ মিলিয়ন পাউন্ড।
এই ঐতিহাসিক সমঝোতা প্রমাণ করল যে, প্রযুক্তি সংস্থাগুলি তাদের মডেলকে যত শক্তিশালীই দাবি করুক না কেন, ভিত্তি তৈরিতে মানুষের লেখা সৃজনশীল কাজই তাদের মূল সম্বল। এই রায় আগামী দিনে এআই প্রযুক্তি সংস্থা এবং বিশ্ব প্রকাশনা শিল্পের মধ্যকার আইনি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এক নতুন রূপ দেবে।


