পুুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু ৷ ১৩ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর সোমবার রাতে তাঁকে গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি ৷ এই বিষয়ে কী বলছে সিপিএম ও কংগ্রেস নেতৃত্ব ?
সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য তথা উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সিপিএমের সম্পাদক পলাশ দাস বলেন,”আরও আগে গ্রেফতার হওয়া উচিত ছিল । এই দুর্নীতি মামলাগুলো এসএসসি টেট এবং এগুলো করতে করতে পাওয়া গেল পৌরসভায় নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতি । এখানে মিউনিসিপ্যালিটিগুলো চলছে কী করে ? সবকটাতে ছাপ্পা ভোট দিয়ে বছরের পর বছর তারা সমস্ত বিরোধী কাউন্সিলর না রেখে গোটা মিউনিসিপ্যালিটিটাকে যাতে লুট করা যায় তার বন্দোবস্ত করেছে । কাটমানি, তোলাবাজি এসবের সঙ্গে যুক্ত হল নবতম সংযোজন টাকা দিয়ে চাকরি ৷ ১৮ বছর ধরে বিভিন্ন এলাকাকে বেআইনি নির্মাণের স্বর্গরাজ্য বানানো হয়েছে । খেলার মাঠ, পুকুর দখল করে বাড়ি বানিয়েছে । বিরাট কমপ্লেক্স হয়েছে । বিএম অ্যাক্ট বিল্ডিং রুল তোয়াক্কা না করে এক একটা ২৬-২৭ তলা বাড়ি তৈরি করেছে । সরু রাস্তা যেখানে একটা চার চাকার গাড়ি ঢুকতে পারে না সেখানে ১০ তলা বাড়ি হচ্ছে । বেপরোয়াভাবে টাকা রোজগার করবার জন্য কোনও রকমের আইন তারা মানেনি ।”
আরও পড়ুনঃ রাজ্যে আসল পরিবর্তন শুরু হল, প্রথমদিন মন্ত্রিসভার কাজ সেরে রাতে পোস্ট মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর
তিনি আরও বলেন, “হাইকোর্টের অর্ডার, গ্রিন বেঞ্চের অর্ডারকে তোয়াক্কা করেনি । এতটাই তাদের ক্ষমতার দম্ভ ছিল । এই যে ভিআইপি রোডের ওপরে এত বড় নয়ানজুলি । একেবারে লেকটাউন থেকে শুরু করে এটা প্রায় উল্টোডাঙার কাছাকাছি যা বিস্তৃত ছিল । কিছু না হলেও সেটা চওড়ায় ছিল প্রায় ৪০ ফুটের উপরে । সেই পুরো নয়ানজুলিটাকে ভরাট করে দিলেন । সেখানে বিনোদনের আসর বসে । কয়েক হাজার গাড়ি পার্কিং হয় এবং সেখান থেকে কী পরিমাণ টাকা উঠে, কার কাছে যায় এগুলো ? একটা বড় মাফিয়া নেটওয়ার্ক এখানে কাজ করেছে ।”
তাঁর কথায়, “এরপর দেখবেন লেকটাউনের একদম ভিআইপি রোডের মুখে একটা ক্লক টাওয়ার বানিয়েছে ৷ ওটার ঠিক উল্টো দিকে একটা বিরাট বাড়ি যার নিচে রেস্টুরেন্ট, গাড়ির শোরুম ইত্যাদি আছে ৷ এই গোটা বাড়িটা অবৈধ ৷ ৮০ বছরের এক কবিরাজ থাকতেন ৷ আনডিভাইডেড প্রপার্টিতে তার জায়গা ছিল । অথচ তিনি জানেনই না এত বড় বাড়ি হয়ে গেল । হাইকোর্টে মামলা হল । ভবন নির্মাণ প্ল্যান ছাড়া অত বড় বাড়ি ভিআইপি রোডের ওপরে হচ্ছে বেআইনিভাবে । সুজিত বোস সেই ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের কাউন্সিলর ৷ বাড়িটা সম্পর্কে হাইকোর্ট যখন ডিমোলিশন অর্ডার দিল মিউনিসিপ্যালিটি সেটাকেও তোয়াক্কা করল না ৷ ও যা যা করেছে তার কাছে এই নিয়োগ দুর্নীতিটা কিছু না । যদি ভালো করে তদন্ত করা যায় তাহলে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি এদের কাছ থেকে বেরোবে ৷ কাজেই আমি মনে করি যে, এই তদন্ত আরও গভীরে যাওয়া দরকার ৷ যে বিপুল পরিমাণ পৌরসভাকে সামনে রেখে সরকারকে সামনে রেখে এরা করেছে সেটা বার করা উচিত ৷ আর ও একা নয়, ওটা করতে পেরেছে আরও বড় নেতার ইন্ধনে ৷ নানান ধরনের কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি কালীঘাট পর্যন্ত পৌঁছয়নি ৷ কাজেই যারা এই গোটা ঘটনায় এত বছর ধরে পশ্চিম বাংলার সর্বনাশ করেছে তাদের প্রত্যেকের তদন্তে আসা দরকার ।”
আরও পড়ুনঃ অয়ন শীলের অফিসের ডাস্টবিন থেকে পাওয়া চিরকুটের সূত্র ধরেই কি ইডির নজরে সুজিত বসু?
প্রাক্তন দমকল মন্ত্রীর গ্রেফতারি প্রসঙ্গে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সদস্য সৌম্য আইচ রায় বলেন,”পশ্চিমবঙ্গে গত ১১-১২ বছরে যত দুর্নীতির তদন্ত হয়েছে, সে দুর্নীতির নামে খেলা হয়েছে । খেলা, কেন্দ্রীয় এজেন্সি দুর্নীতির নামে কার্যত তৃণমূলকে ক্লিনচিট দিয়েছে । শুধু বিটিং অ্যারাউন্ড দ্যা বুর্জ, ঘুরে ফিরে বেরিয়েছে । আর গ্রেফতারির নাটক করেছে । আমি জানিনা আগামী দিনে ছাড়া পেয়ে যাবেন কিনা । যেরকম বাকি তৃণমূলের নেতারা বাইরে আছে, দুর্নীতি দুর্নীতি তদন্তের খেলা । বিজেপি আর তৃণমূলের আর এই কেন্দ্রীয় এজেন্সির খেলা বাংলার মানুষ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে । আসলে মাথারা বাইরে আছে । গরু, কয়লা, বালি, কাটমানি সিন্ডিকেট; সবের যে মাথা, তারা এখনও কালীঘাট এবং ক্যামাক স্ট্রিটে বসে আছে । আমার মনে হয় তদন্তের গভীরে যাওয়া উচিত এবং চরমতম শাস্তি পাওয়া উচিত তাদের । আগামী দিনে বাংলার ১১ কোটি মানুষ তাকিয়ে থাকবে, দাঁড়িয়ে দেখবে যে তদন্তের কিনারা হয় কিনা । পুরনো তদন্তগুলো যেমন শিক্ষা দফতরের দুর্নীতি, চাকরি চুরির মতো তদন্ত যেন অন্ধকারে গলিতে হারিয়ে না যায় । এটা কিন্তু বাংলার মানুষ অপেক্ষায় থাকবে । চিট ফান্ডের মালিকরা এখনও ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে । ফলে তদন্তর খেলাটা বন্ধ হোক, আসল তদন্ত হোক এবং সত্যি দোষী হলে তার দোষীদের কঠোর শাস্তি হবে এবং মাথা ধরতে হবে । ছোটখাটো নয়, মাথা ধরতে হবে ।“


