রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা প্রত্যাহার নিয়ে রাজনৈতিক মহলে যে তীব্র জল্পনা তৈরি হয়েছে, তা কার্যত নস্যাৎ করে দিল প্রশাসন । প্রশাসনিক শীর্ষ স্তরের স্পষ্ট দাবি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তায় বিন্দুমাত্র কাটছাঁট করা হয়নি ।
বরং, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রথম দিন নবান্নে দায়িত্বভার গ্রহণ করেই পুলিশ প্রশাসনকে এই বিষয়ে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন । রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, “প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বয়স হয়েছে । তাঁর যেন কোনও অসুবিধা না হয় তা নিশ্চিত করবেন । তাঁর নিরাপত্তায় যেন কোনও রকমের ত্রুটি না থাকে ।”
প্রশাসনের দাবি, সেই নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হচ্ছে । প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের চারপাশে যেমন পুলিশি প্রহরা রয়েছে, তেমনই তাঁর সার্বিক ‘জেড প্লাস’ নিরাপত্তাতেও কোনও শিথিলতা নেই ।
আরও পড়ুনঃ নিরাপত্তাহীন ‘পিসি’? পুলিশ কিয়স্ক সম্পূর্ণ ফাঁকা
নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় মূলত বুধবার রাতে । তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন একটি ফেসবুক লাইভ করে দাবি করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ির সামনে কোনও নিরাপত্তারক্ষী নেই । যে কেউ অনায়াসে সেখানে প্রবেশ করতে পারে বলে তিনি অভিযোগ তোলেন । একই সঙ্গে তাঁর দাবি ছিল, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘদিনের দুই বিশ্বস্ত নিরাপত্তারক্ষীকে প্রশাসন আচমকা সরিয়ে নিয়েছে ।
ডেরেকের এই ভিডিয়ো দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেই চাঞ্চল্য ছড়ায় । কিন্তু পুলিশের একটি সূত্রের পাল্টা দাবি, বুধবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যে মিছিলটি করেছিলেন, সে বিষয়ে প্রশাসনের কাছে আগাম কোনও অফিশিয়াল তথ্য ছিল না । তা সত্ত্বেও খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ তাঁর যাতায়াতের পথে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করে ।
নবান্ন সূত্রের খবর, গোটা সমস্যার মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী বা পিএসও নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর একটি বিশেষ দাবি । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইছেন, দীর্ঘদিনের পরিচিত স্বরূপ গোস্বামী এবং কুসুম কুমার দ্বিবেদীকেই তাঁর পাহারায় রাখতে হবে । এই নির্দিষ্ট দুই অফিসার ছাড়া অন্য কাউকে তিনি তাঁর নিরাপত্তা বলয়ে রাখতে নারাজ ।
এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনিক শীর্ষ আধিকারিকের বক্তব্য, সরকারি নিয়মে এভাবে ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে আধিকারিক নিয়োগের কোনও সুযোগ নেই । ডিউটি রস্টার এবং নির্দিষ্ট সরকারি প্রোটোকল মেনেই নিরাপত্তারক্ষী বদল করা হয় । এক্ষেত্রেও সেই স্বাভাবিক প্রশাসনিক রদবদলই ঘটেছে । আধিকারিকদের কথায়, সরকারি কাঠামোয় এমন ব্যক্তিগত দাবি মেনে নেওয়ার কোনও উপায় নেই ।
এই গোটা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে রাজ্য রাজনীতির অন্দরে উঠে এসেছে এক অতীতের স্মৃতি । বর্তমান যিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অর্থাৎ শুভেন্দু অধিকারী, তিনি যখন প্রাক্তন সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, তখন তাঁর নিরাপত্তায় যে দুই স্থায়ী পিএসও থাকতেন । পরবর্তীতে তিনি বিরোধী দলনেতা হওয়ার পর কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পেলেও, প্রথম কয়েক মাস ওই দুই রাজ্য পুলিশ কর্মী তাঁর সঙ্গেই ছিলেন ।
আরও পড়ুনঃ চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি! ডিম থেরাপি এবার বানারহাটে
কিন্তু অভিযোগ, ২০২১ সালের নির্বাচনের পর তৎকালীন পুলিশমন্ত্রীর নির্দেশে ওই দুই নিরাপত্তারক্ষীকে রাতারাতি সরিয়ে দেওয়া হয় । শুধু তাই নয়, তাঁদের একজনকে সিআইডি দফতরে ডেকে জেরা পর্যন্ত করা হয় এবং পরে পুরুলিয়ায় বদলি করে সাসপেন্ড করার মতো কড়া পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল । অর্থাৎ, বিরোধী দলনেতার সাংবিধানিক পদে থাকা সত্ত্বেও শুভেন্দু অধিকারীর পুরনো পিএসও-দের রাখার আর্জি সে সময় গ্রাহ্য হয়নি ।
নবান্নের একাংশের মতে, আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও প্রশাসন সেই একই নিয়ম এবং প্রোটোকলের পথেই হাঁটছে । নির্দিষ্ট অফিসারকে ধরে রাখার জেদ প্রশাসনিক নিয়মে খাটে না, তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সামগ্রিক নিরাপত্তায় কোনও আপোস করা হচ্ছে না । এক বিজেপি বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদদের ভিডিয়ো প্রসঙ্গে বলেছেন, “মাননীয়া তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সাংসদকে দিয়ে এসব না করালেই পারতেন । সরকার যখন বলছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার বিষয়ে কোনওরকম আপোস করা হবে না । সেখানে দাঁড়িয়ে সংসদের দেখানো ভিডিয়ো নাটক ছাড়া কিছু নয় ।”


