পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনটা এবার আম হতে চলেছে। না না হিন্দি বা বাংলার আম নয়। AAM, অর্থাৎ Ab Ayega Maza!
এই তো গত দুই সপ্তাহ আগে এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক দুঃখ করে বলছিলেন যে এইবারের ভোটটা তাঁর একপেশে লাগছে। Exciting লাগছেনা। আমি মুখ্যু মানুষ। মাথা চুলকে বলেছিলাম, “একেবারেই কি exciting হবেনা? আমার তো ঠিক তা মনে হচ্ছে না।”
দেখুন কেমন ভোট ঘোষণা হতেই একেবারে “ধুম তানা নানা নানা” (একতা কপূর কায়দায়) অবস্থা। একদিকে ৬৩ লক্ষ নির্বাচকের নাম বাদ বা ৬০ লক্ষ নির্বাচকের নাম বিচারাধীন থাকার জট তো পাকিয়ে রয়েছেই। সেটা বাদ দিয়েও যদি বলি রাজনৈতিক টেবিল টেনিস কী আর কম হচ্ছে!?
আরও পড়ুনঃ লড়াই করল মীনাক্ষী, আর বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন তিলোত্তমার মা
ভোট ঘোষণার একদিনের মাথায় ১৯২ টি কেন্দ্রে প্রার্থী ঘোষণা করে দিল বামফ্রন্ট। এবার আপনারা বলবেন শূন্য পাওয়া দলের আবার প্রার্থী তালিকা। কিন্তু আমি তো গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনও গণতান্ত্রিক দলকে নাকচ করে দেওয়ার পক্ষপাতী নয়। এবং বিশ্বাস করি যে এই দুর্দিনেও এক লপ্তে ১৯২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দেওয়াটা, এবং সবার আগে করাটা প্রশংসনীয়। (যদিও technically সবার আগে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে SUCI!)
কিন্তু আরও বড় চমক অপেক্ষা করছিল ১৬ তারিখ বিকেল সন্ধ্যার দিকে। বিজেপি নেতা ও বর্তমানের বিরোধী দলনেতা যে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম দুই কেন্দ্রেই প্রার্থী হবেন এমনটা শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু ঘোষণা হতেই একটা রে রে ব্যাপার হয়ে গেল। বাকি ১৪২ টি কেন্দ্রতেও সেদিন বিজেপি নাম ঘোষণা করেছিল। কিন্তু এক খড়্গপুর সদরে দিলীপ ঘোষের প্রার্থীতা ফেরত পাওয়া ছাড়া বিশেষ নজর কাড়েনি অন্য কিছু। পুরো সন্ধ্যাটা হয়ে উঠল শুভেন্দু-ময়।
এবার অপেক্ষা ছিল তৃণমূলের প্রার্থী তালিকার। ১৭ তারিখ দুপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতার বন্দ্যোপাধ্যায় একপাশে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যপাশে সুব্রত বক্সিকে নিয়ে ২৯১ টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দিলেন। মজার বিষয় হল এর আগেই ১৭ তারিখ সারাদিন ধরে, সারা রাজ্যজুড়ে ১৩ জন নতুন ব্যক্তি তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। তার সকলেই সেদিন প্রার্থীপদ পেলেন। তবে অবশ্যই নজর ছিল ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামে কী করেন তৃণমূল নেতৃত্ব।
মমতা ভবানীপুর ছেড়ে যাবেননা। ওটা ওনার বাড়ি। কিন্তু মমতার গতবার নন্দীগ্রামে গেছিলেন। বলা হয় সেটা শুভেন্দুকে নন্দীগ্রামে আটকে দেওয়ার কৌশল। এবারে মমতা আর নন্দীগ্রামে যাননি। তৃণমূল বলছে “যাঁদের একটা আসনে হেরে যাবার নিশ্চয়তা থাকে তাঁরা দুটি আসনে লড়েন । মমতা সেইসবে নেই।”
তার বদলে মমতা নন্দীগ্রামে প্রার্থী করলেন, হিন্দু সংহতি সহ বিভিন্ন হিন্দু মঞ্চে কাজ করে ও নেতৃত্ব দিয়ে আসা পবিত্র করকে, যিনি এক সময় তৃণমূল করতেন, ২০২০ সালে শুভেন্দুর সঙ্গে বিজেপিতে যান তবে ১৭ তারিখ অভিষেকের হাত ধরে ফেরত আসেন তৃণমূলে। পবিত্র নন্দীগ্রাম ২ ব্লকের গয়াল অঞ্চলের বাসিন্দা, শুভেন্দুর (প্রাক্তন) খাস লোক। গত ৭-৮ মাস ধরে আইপ্যাক ও তৃণমূল পবিত্রকে নার্চার করেছে। তিনি নাকি শুভেন্দুর উপরে ‘ক্ষুব্ধ’। নন্দীগ্রাম ২ ব্লক হিন্দু এবং নন্দীগ্রাম ১ ব্লক মুসলমান অধ্যুষিত। প্রথমে ব্লকে তৃণমূল এমনিই এগিয়ে। এবার দ্বিতীয় ব্লকের হিন্দু নেতা পবিত্র তৃণমূলের কোনও কার লাগে কি না সেটা দেখার। আবার হিন্দুত্ববাদী নেতাকে প্রার্থী করা হয়েছে বলে সংখ্যালঘুরা তৃণমূলের উপর রেগে যাবেননা তো? (উল্লেখ্য বালিগঞ্জ উপনির্বাচন।)
তৃণমূল বলছে এটা মাস্টারস্ট্রোক। বিজেপি বলছে শুভেন্দুকে নন্দীগ্রামে ওয়াকোভার দিল তৃণমূল। তৃণমূল এও বলছে দুটি কেন্দ্রে শুভেন্দুকে দাঁড় করিয়ে নাকি রাজ্য বিজেপির একাংশ তাঁর ক্ষতি করে দিল, ইচ্ছে করে। কিন্তু এটাও স্বীকার্য যে ২০২১-এ শুভেন্দুর বিজেপির সার্টিফিকেশন দরকার হলেও, পাঁচ বছরে উনিই বিজেপির সেট নেতা হয়ে উঠেছেন এই রাজ্যে। এবং মমতার বিরুদ্ধে তাঁকে লড়তে পাঠানোর একটা বার্তা হতে পারে যে তাঁকে দল এতটাই ভরসা করে।
আরও পড়ুনঃ ভারতের মাটিতে CIA shadow operation! কম খরচে বড় ক্ষতি
তব সবচাইতে “ধুম তানা নানা নানা” (একতা কপূর কায়দায়) ঘটিয়ে চলেছে নির্বাচন কমিশন। একের পর এক আমলা বদল করে। ভোট ঘোষণার দিনেই মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্রসচিব অপসারিত। ইতিহাসে কখনও মুখ্যসচিবকে অপসারিত হতে হয়নি। তারপর একে একে রাজ্যের ও কলকাতার পুলিশ প্রধান, অন্যান্য পদস্থ পুলিশ আধিকারিক এবং জেলাশাসকদের বদলি করা হল। আরও কত যে বদল হবে সেসব এখন সময়ের অপেক্ষা।
তবে এই সবকিছুর মধ্যে আমার সবথেকে ভালো লাগল যেই বিষয়টা সেটা হল এই যে না বিজেপি না তৃণমূল (যাঁদের সবথেক বেশি সেই সম্ভাবনা থাকে) তাঁরা কেউই তেমন সেলিব্রিটি নির্ভর প্রার্থী তালিকা এইবার বানাননি।
যাই হোক, সবাই তৈরি থাকুন এখনও অনেক “ধুম তানা নানা নানা” (একতা কপূর কায়দায়) বাকি আছে।




