তৃণমূলের ক্ষমতার মিনার ভেঙে পড়ার পর থেকেই দলের অন্দরে আলোচ্য হয়ে উঠেছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা। তাঁর কর্পোরেট কায়দা, পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাককে সংগঠনের সমান্তরাল করে তোলা নিয়ে নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে ক্ষোভ গোপন করছেন না। বুধবার তৃণমূলের টিকিটে জয়ীদের বৈঠকে সেই অভিষেকের ‘লড়াইকে’ সম্মান দিতে উঠে দাঁড়াতে হল সকলকে। উঠতে হল অভিষেকের জন্মের আগে থেকে রাজনীতির আঙিনায় থাকা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, সমর মুখোপাধ্যায়, জাভেদ খান, ফিরহাদ হাকিমদেরও।
কালীঘাটের বাড়িতে তৃণমূলের জয়ী ৮০ জন প্রার্থীকে ডেকেছিলেন ইস্তফা দিতে না-চাওয়া ‘মুখ্যমন্ত্রী’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈঠকে ছিলেন অভিষেকও। সূত্রের খবর, সেই বৈঠকেই অভিষেকের লড়াইকে সম্মান জানানোর নির্দেশ দেন মমতা। তৃণমূলের টিকিটে এ বারও জেতা এক প্রার্থী বলেন, ‘‘অভিষেকের লড়াইকে সম্মান জানতে মমতাই সকলকে বলেন উঠে দাঁড়াতে।’’ রতুয়ার প্রবীণ বিধায়ক সমর, বালিগঞ্জ থেকে জেতা শোভনদেব, কলকাতার মেয়র তথা বন্দর আসন থেকে জেতা ফিরহাদ, বজবজ থেকে জেতা অশোক দেব— সকলকেই উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে হয়েছে অভিষেকের প্রতি। যা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে তৃণমূলের মধ্যে। সূত্রের খবর, মমতার নির্দেশ মেনে অনেককে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে হয়েছে ঠিকই। তবে অনেকেই চেয়ার ছেড়ে উঠতে ইতস্তত করেছেন। জয়ী এক প্রার্থী বলেন, ‘‘বসেও তো হাততালি দেওয়া যেত। কিন্তু হাঁটুর বয়সি অভিষেকের সামনে উঠে দাঁড়ানো প্রবীণ নেতাদের কাছে দৃশ্যতই অস্বস্তিকর ছিল।’’ তবে বৈঠকের ভিতরে উঠে দাঁড়ালেও বাইরে বেরিয়ে কেউই বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি। যা খানিকটা প্রত্যাশিতই।
আরও পড়ুনঃ বেনোজল রুখতে মরিয়া পদ্মফুল শিবির; বাম, তৃণমূল হয়ে এবার রামের দরজায় মিরজাফরের দল!
তৃণমূল সূত্রে আরও খবর, মমতা স্পষ্ট বার্তা দিয়ে দিয়েছেন, অভিষেকের সমালোচনা করলে পার্টি বরদাস্ত করবে না। শৃঙ্খলা রাখার বিষয়ে তিনি একটি শৃঙ্খলারক্ষা কমিটিও গড়ে দিয়েছেন। যাতে রাখা হয়েছে রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শুভাশিস চক্রবর্তী এবং ধনেখালির জয়ী প্রার্থী অসীমা পাত্রকে। ডেরেককে অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে বসার দায়িত্ব দিয়েছেন মমতা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিনি সেখানে থাকবেন।
তৃণমূলের টিকিটে এ বার জিতেছেন সাকুল্যে ৮০ জন। সূত্রের খবর, বুধবারের বৈঠকে জয়ীদের মধ্যে ১১ জন হাজির ছিলেন না। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাসনের কাজল শেখ এবং আমডাঙা থেকে জয়ী তথা ফুরফুরা শরিফের পিরজাদা কাশেম সিদ্দিকি।
বৈঠকে মমতা দাবি করেছেন, লু়ট করে তৃণমূলকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ফলাফল ‘মানুষের রায়’ নয়। গণনাকেন্দ্র দখল করে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। যদিও যাঁরা জিতেছেন, তাঁদের একাংশ একান্ত আলোচনায় প্রশ্ন তুলছেন, তা হলে তাঁরা জিতলেন কী করে? তাঁদের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটল না কেন? সূত্রের খবর, বৈঠকে অভিষেক দাবি করেছেন, তৃণমূল অন্তত ১৮০টি কেন্দ্রে জিতেছে! মেমারির একটি বুথের ইভিএমে ৯৯ শতাংশ চার্জ থাকার তথ্য জানিয়ে অভিষেক বৈঠকে কারচুপির অভিযোগ করেছেন।
বুধবারের বৈঠকেও মমতা লড়াই করে ফিরে আসার বার্তা দিয়েছেন। তৃণমূলনেত্রী বলেছেন, দেশকে দেখিয়ে দেবেন তিনি কী! আবার লড়াই করবেন। আন্দোলন করবেন। মমতার অভিযোগ, তৃণমূলকে হারানোর জন্য গত ছ’মাস ধরে রাজ্যে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি করে রাখা হয়েছিল। তার পরেও হারানো যাচ্ছে না দেখে গণনাকেন্দ্র দখল করার পন্থা নেয়। জোর করে হারানো হয়েছে বলেই সর্বভারতীয় স্তরের বিজেপি-বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র নেতারা তৃণমূলের পাশে রয়েছে বলে দাবি করেছেন মমতা। ভোটপ্রক্রিয়া এবং গণনাকেন্দ্র সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে আদালতে যাওয়ার কথাও বলেছেন মমতা। এ ব্যাপারে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গত তিন মেয়াদের বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমানকে। সূত্রের খবর, মমতা বলেছেন, প্রয়োজনে তিনি আন্তর্জাতিক আদালতেও যাবেন।
আরও পড়ুনঃ শুভেন্দুর আপ্তসহায়ককে তিন রাউন্ড গুলি! ঘটনাস্থলেই মৃত্যু; নিন্দা বাম-কংগ্রেসের
কেন তিনি পদত্যাগ করছেন না, বৈঠকে তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন মমতা। সূত্রের খবর, তৃণমূলনেত্রী বলেছেন, এটাই তাঁর ‘প্রতিবাদ’। অভিষেকও একই কথা বলেছেন বলে খবর। তাঁর বক্তব্য, জোর করে ক্ষমতাচ্যুত করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেই মমতা মুখ্যমন্ত্রীপদ থেকে ইস্তফা দেননি। সূত্রের খবর, মমতা আরও বলেছেন, তিনি চান তাঁকে বরখাস্ত করা হোক। সেটা হবে একটা ‘কালো দিন’। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিবাদ জানাতে বিধানসভা অধিবেশনের প্রথম দিন সকলকে কালো পোশাক পরে যাওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী।
তৃণমূল বিরোধীদল হিসাবেই রাজ্য বিধানসভায় যাবে। আগামী পাঁচ বছর তাদের বিরোধী আসনেই বসতে হবে। এবং বসতে হবে এমন এক সরকারপক্ষের বিপরীতে, যাদের গত পাঁচ বছর সভার ভিতরে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। যাদের দলনেতাকে পাঁচ বার নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে। ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল যখন ভেঙে পড়েছে, ঘুরে দাঁড়ানোর দিশা পাচ্ছেন না অনেকেই, তখন দলের অন্দরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিল অভিষেকের প্রতি সম্মান জ্ঞাপনে জয়ীদের উঠে দাঁড়ানোর বিষয়ে নেত্রী মমতার নির্দেশ।


