বারুইপুরে ১১ বছরের নাবালিকা গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশের গুলিতে (এনকাউন্টার) মৃত্যুর ঘটনা রাজ্যজুড়ে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং ‘তাৎক্ষণিক বিচার’-এর প্রতি ক্রমবর্ধমান সমর্থনের বিষয়টি তুলে ধরেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পুলিশের দাবি: পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় প্রভাস মণ্ডলের পুলিশের সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং গুলি চালান। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে তার মৃত্যু হয়।
আরও পরুনঃ ধর্মতলা বিক্ষোভে হিংসায় তৃণমূল যোগের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তি সহ ১১ জন শুক্রবারী গ্রেফতার
জনগণের প্রতিক্রিয়া ও হতাশা: সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ এই ঘটনায় উল্লাস প্রকাশ করেছে। তাঁদের মতে, এটিই প্রকৃত বিচার। বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতে বছরের পর বছর ধরে চলা মামলা (যেমন কামদুনি মামলা) এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণেই সাধারণ মানুষ বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে এবং এই ধরনের ‘এনকাউন্টার’ বা তাৎক্ষণিক বিচারকে সমর্থন করছে।
বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ:
-
প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়: তিনি এই প্রবণতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, আইনি দীর্ঘসূত্রতা এবং রাষ্ট্রপক্ষের (পুলিশ ও আইনজীবী) গাফিলতি মানুষকে হতাশ করছে ঠিকই, কিন্তু আদালতের বাইরে বিচার কাম্য নয়।
-
মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র: তাঁর মতে, জনমতের চাপে বা জনরোষ সামলাতে তাৎক্ষণিক বিচারের এই প্রবণতা আইনের শাসনকে ধ্বংস করে। এর ফলে প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করে নিরীহ কাউকে ফাঁসানোর (বলির পাঁঠা বানানোর) ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরিসংখ্যানের উদ্বেগজনক চিত্র: দেশে বর্তমানে ৫ কোটিরও বেশি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে আমাদের রাজ্যেই সাড়ে সাত লক্ষেরও বেশি মামলা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। খুনের মামলায় শাস্তির হার ৪০-৪৫% এবং ধর্ষণের ক্ষেত্রে তা মাত্র ২০-২৫%। এছাড়া, দেশের জেলে থাকা বন্দিদের প্রায় ৭৫-৭৭ শতাংশই বিচারাধীন।
নির্যাতিতার পরিবারের সন্দেহ: আশ্চর্যজনকভাবে, খোদ নির্যাতিতার পরিবার এই এনকাউন্টারে খুশি নয়। তাদের অভিযোগ, প্রভাস অন্যান্য অপরাধীদের নাম বলে দিচ্ছিল। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই পুলিশ তাকে ‘সরিয়ে’ দিয়েছে।
উপসংহার: বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিকাঠামোগত অভাব মানুষকে ‘তাৎক্ষণিক বিচার’-এর দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে। কিন্তু আইনের শাসন এড়িয়ে ভুয়ো এনকাউন্টার বা মর্জিমত শাস্তির স্বাভাবিকীকরণ একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। বিলম্বিত বিচার যেমন অবিচার, তেমনই তাৎক্ষণিক বিচারও অবিচারের নামান্তর হতে পারে। বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে দ্রুত পদ্ধতিগত সংস্কার প্রয়োজন।


