বিশেষ নিবন্ধ:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক অনন্য নাম। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিক তাঁর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে সাধারণ ও অবহেলিত মানুষের দরদকে পরম মমতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনকালেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জনকারী এই লেখকের বই অনূদিত হয়েছে ভারতের একাধিক ভাষায়। ১৯২৩ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ এবং ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ‘ডিলিট’ উপাধিতে ভূষিত হন তিনি।
অনিলাদেবী ছদ্মনামে সাহিত্য জগতে আত্মপ্রকাশ করা শরৎচন্দ্রের এই নামের নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল তাঁর প্রিয় বড়দিদি অনিলা দেবীর স্মৃতি।
আরও পড়ুনঃ সিপিএম-এর ‘আধিপত্যবাদী’ বলে তোপ আরএসপি-র মহম্মদ সফির; পাত্তা দিতে নারাজ সিপিএম
শরৎচন্দ্রের জীবনের প্রধান পর্যায় ও ঐতিহাসিক ঘটনাপঞ্জি
কথাসাহিত্যিকের জীবনসংগ্রাম, সাহিত্যকর্ম ও রেঙ্গুন জীবনের নানা অধ্যায় নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| জীবনের অধ্যায় / ক্ষেত্র | সাহিত্যিক ও ব্যক্তিগত জীবনের বিবরণ |
| প্রথম সাহিত্য সৃষ্টি | ১৮৯২ সালে হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে পড়ার সময় ‘কাশীনাথ’ ও ‘ব্রহ্মদৈত্য’ গল্প রচনা। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘মন্দির’ (১৯০২-০৩, কুন্তলীন পুরস্কারপ্রাপ্ত), যা মামা সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে ছাপা হয়েছিল। |
| ভবঘুরে জীবন ও ‘শ্রীকান্ত’ | ২৫-২৬ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসীর বেশে ঘোরাফেরা। এই সময়েই তিনি দরিদ্র, লাঞ্ছিত ও জাতপাতের বেড়াজালে বন্দি ভারতকে প্রত্যক্ষ করেন, যা পরবর্তীতে ‘শ্রীকান্ত’-সহ বিভিন্ন উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়। |
| রেঙ্গুন জীবন (১৯০৩–১৯১৬) | ইয়াঙ্গুনের বোটাটং পোজনডং অঞ্চলে কাঠের দোতলা টিনের ঘরে বসবাস। মাসে ৯০ টাকা বেতন ও ১০ টাকা অ্যালাউন্সে চাকরি এবং সান্ধ্যকালীন একটি চায়ের দোকান পরিচালনা। |
| ‘দাদাঠাকুর’ ও জনসেবা | সাধারণ মিস্ত্রি ও শ্রমিকদের চিঠি লিখে দেওয়া, ঝগড়া মেটানো এবং হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় পাশে থাকার কারণে শ্রমিকদের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ‘দাদাঠাকুর’। |
| পারিবারিক ট্র্যাজেডি | চক্রবর্তী উপাধিধারী এক মিস্ত্রির কন্যাকে (শান্তিদেবী) অসম বিয়ে থেকে বাঁচাতে বিবাহ করেন। কিন্তু প্লেগে আক্রান্ত হয়ে স্ত্রী ও এক বছরের শিশুপুত্রের করুণ মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে ১৪ বছরের কিশোরী মোক্ষদাকে বিয়ে করে নাম রাখেন ‘হিরণ্ময়ী দেবী’। |
আরও পড়ুনঃ শান্ত সমুদ্রের পেটে জমেছে প্রকাণ্ড শক্তি!! টগবগিয়ে ফুটছে বঙ্গোপসাগর
চলচ্চিত্র রূপান্তর ও রসিক সাহিত্যিকের স্মৃতি
১৯১৬ সালে স্বদেশে ফিরে পূর্ণাঙ্গভাবে সাহিত্যকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন শরৎচন্দ্র। তাঁর জীবিতকালেই একাধিক উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়—যার মধ্যে রয়েছে ১৯২২ সালের নির্বাক ছবি ‘আঁধারে আলো’, ১৯৩১ সালের প্রথম দিকের সবাক ছবি ‘দেনা-পাওনা’ এবং ১৯৩৫ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার অভিনয়ে নির্মিত বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’।
সাহিত্যিক হিসেবে অত্যন্ত গভীর ও আত্মমগ্ন হলেও ব্যক্তিগত জীবনে শরৎচন্দ্র ছিলেন দারুণ রসিক মানুষ। ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় যখন তাঁর ‘অরক্ষণীয়া’ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল, তখন সম্পাদক হরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের অনুরোধে তিনি উপন্যাসের শেষ পরিণতি কিছুটা বদলে দেন। শ্মশান থেকে জ্ঞানদাকে অতুল নিয়ে যাওয়ার পর গল্প শেষ হলে উৎসুক পাঠকদের চিঠির বন্যায় সম্পাদকের যায় যায় অবস্থা! আকুল সম্পাদকের আর্জি শুনে শরৎচন্দ্র হেসে উত্তর দিয়েছিলেন—
“বলে দিন না, তারপর জ্ঞানদা বা অতুল কারও সঙ্গেই আর শরৎবাবুর দেখা হয়নি। তাহলেই লেঠা চুকে যায়!”
জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও দারিদ্র্যকে জয় করে এভাবেই বাঙালি পাঠকের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।


