বিশেষ ঐতিহ্য ও ভক্তিভাবাপন্ন প্রতিবেদন:
পূর্ব বর্ধমান শহরের বোরহাট (কোটালহাট) এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘কমলাকান্ত কালীবাড়ি’ কেবল এক প্রাচীন দেবালয় নয়, এটি পরম শাক্ত সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এবং তাঁর আরাধ্যা ‘জীবন্ত’ কালীমায়ের এক আশ্চর্য ও মহিমান্বিত লীলাক্ষেত্র। যে সাধকের পদাবলী ও ভক্তিমূলক গানে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ভাবসমাধিস্থ হয়ে পড়তেন, সেই ‘কালীর ব্যাটা’ কমলাকান্তের স্মৃতিবিজড়িত এই সাধনপীঠের আনাচে-কানাচে আজও জড়িয়ে রয়েছে একের পর এক বিস্ময়কর অলৌকিক ইতিহাস।
আরও পড়ুনঃ আজই রাজ্যে জোড়া এনকাউন্টার, গাইঘাটার পর ধুলিয়ান; কেঁপে উঠল রাজ্য
দারিদ্র্য থেকে বর্ধমান রাজসভার সভাপণ্ডিত
আনুমানিক ১৭৬৯ সালে অম্বিকা কালনার এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হয় কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পিতা মহেশ্বর ভট্টাচার্যের প্রয়াণের পর মা মহামায়া দেবীর সঙ্গে গলসির চান্না গ্রামে মামারবাড়িতে চলে আসেন তিনি। চরম অভাব-অনটনের মধ্যেও তিনি সংস্কৃত ও ব্যাকরণে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং টোল স্থাপন করেন।
প্রথম জীবনে চন্দ্রশেখর গোস্বামীর কাছে দীক্ষিত হলেও, পরবর্তীতে প্রখ্যাত তান্ত্রিক কেনারাম ভট্টাচার্যের সংস্পর্শে এসে তিনি তন্ত্রসাধনায় ব্রতী হন এবং চান্না গ্রামের বিশালাক্ষী মন্দিরে সিদ্ধিলাভ করেন।
কমলাকান্তের অগাধ ভক্তি ও সিদ্ধির কথা জানতে পেরে বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজা তেজচন্দ্র মহতাব (তেজচাঁদ) ১২১৬ বঙ্গাব্দে (১৮০৯ সাল) তাঁকে সসম্মানে বর্ধমানে নিয়ে আসেন। রাজসভার সভাপণ্ডিত ও নিজের কুলগুরু হিসেবে গ্রহণ করার পাশাপাশি, রাজকুমার প্রতাপচাঁদকে সঠিক পথে ফেরানোর গুরুদায়িত্বও কমলাকান্তের ওপর ন্যস্ত করেন মহারাজা।
পঞ্চমুণ্ডির আসন ও মৃন্ময়ী প্রতিমায় রক্তক্ষরণ
মহারাজা তেজচাঁদ গুরু কমলাকান্তকে থাকার জন্য লাকুর্ডিতে একটি বাড়ি এবং সাধনার জন্য কোটালহাটে ১২ কাঠা জমি দান করেন। সেই জমিতে খড়ের চালাঘর তুলে সাধক প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহাসিক ‘পঞ্চমুণ্ডির আসন’ এবং তার পেছনে রোপণ করেন একটি বেলগাছ।
কথিত আছে, সাধক কমলাকান্তকে ঘিরে এই মন্দিরে বহু অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে:
-
মূর্তিতে রক্তক্ষরণ: মায়ের জীবন্ত উপস্থিতি নিয়ে মহারাজা তেজচাঁদের মনে সন্দেহ জাগলে, সাধক মৃন্ময়ী মূর্তির পায়ে একটি বেলকাঁটা ফুটিয়ে দেন। সবিস্ময়ে মহারাজা দেখেন, মাটির প্রতিমার পা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে!
-
ঘোর অমানিশায় পূর্ণিমার চাঁদ: মহারাজার ইচ্ছাপূরণে অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার আকাশে সাধক কমলাকান্ত অলৌকিকভাবে পূর্ণিমার চাঁদ দর্শন করিয়েছিলেন।
-
কমণ্ডলুতে সুরা থেকে দুধ: কমলাকান্তের কমণ্ডলুতে মদ রয়েছে ভেবে মহারাজা প্রশ্ন তুললে সাধক জানান তাতে দুধ রয়েছে, এবং মুহূর্তের মধ্যে কমণ্ডলু থেকে সাদা দুধ ঢেলে রাজাকে দেখান।
“কী গরজ আমি গঙ্গাতীরে যাব”: পাতাল ফুঁড়ে মায়ের গঙ্গা আগমন
১৮২১ সালে সাধকের জীবনের শেষ দিনগুলিতে ঘটে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। তৎকালীন রীতি অনুযায়ী মুমূর্ষু কমলাকান্তকে গঙ্গার তীরে ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ বা কাশীতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন মহারাজা। কিন্তু মাকে ছেড়ে যেতে অস্বীকার করে সাধক গেয়ে ওঠেন তাঁর কালজয়ী পদ:
“কী গরজ আমি গঙ্গাতীরে যাব, কালো মায়ের কালো ছেলে বিমাতার কি শরণ নেব?”
ভক্তদের বিশ্বাস, সন্তান না যাওয়ায় স্বয়ং মা গঙ্গাই সাধকের টানে মন্দিরের মাটি ফুঁড়ে প্রবল বেগে বেরিয়ে আসেন। আজও মন্দিরে সেই স্থানটি কুয়োর মতো বাঁধানো রয়েছে এবং সেই জলই গঙ্গাজল হিসেবে দেবীর নিত্যপুজোয় ব্যবহৃত হয়।
আরও পড়ুনঃ জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সব মামলার শুনানি স্থগিত
সমাধির ওপর কষ্টিপাথরের বিগ্রহ ও অমাবস্যার পুজো
কমলাকান্ত যেহেতু বৈষ্ণব ও শাক্ত—দুই ধারাতেই সাধনা করেছিলেন, তাই তাঁর ইচ্ছানুসারে মৃত্যুর পর তাঁকে দাহ না করে মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবীর বেদির ঠিক নিচে সমাধিস্থ করা হয়।
-
নামকরণ ও বিগ্রহ: কমলাকান্ত সর্বদা নিজেকে “কালীর ব্যাটা কমলাকান্ত” বলে পরিচয় দিতেন, সেই থেকেই মায়ের নাম হয় ‘কমলাকান্ত কালী’। ১৯৭০ সালের পর থেকে ভক্তদের উদ্যোগে সাধকের সমাধির ওপর সাড়ে ৬ ফুট উচ্চতার এক অপূর্ব কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি স্থাপন করা হয়, যার আদলে কালী ও কৃষ্ণ—দুই ভাবেরই মেলবন্ধন ঘটেছে।
-
মাগুর মাছের ভোগ: সাধক কমলাকান্ত মাগুর মাছ খেতে ভালোবাসতেন। তাঁর সেই খাদ্যাভ্যাসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আজও মায়ের নিত্যভোগে আবশ্যিকভাবে মাগুর মাছের পদ (মাছের টক ব্যতিকে) নিবেদন করা হয়।
-
নিশি পুজো ও অন্নকূট: দীপান্বিতা অমাবস্যার মহানিশায় রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ তন্ত্রমতে দেবীর পুজো হয়। ছাগবলির প্রথা উঠে গিয়ে এখন চালকুমড়ো ও আখ বলি দেওয়া হয়। পরের দিন আয়োজিত হয় বিশাল অন্নকূট উৎসব, যেখানে ৫ থেকে ১০ হাজার ভক্তের মহা প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
“মজিল মোর মনভ্রমরা কালীপদ নীলকমলে”—সাধক কমলাকান্তের এই চিরন্তন সুর আজও যেন বর্ধমানের বোরহাটের এই পবিত্র সাধনপীঠের বাতাসে ভেসে বেড়ায়।


