বিশেষ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদন:
প্রবল সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় বা অতি তীব্র সাইক্লোনের ধাক্কায় শুধু উপকূলবর্তী অঞ্চলেই যে ক্ষয়ক্ষতি সীমাবদ্ধ থাকে তা নয়, এবার তার প্রত্যক্ষ প্রভাবে ভূগর্ভেও সৃষ্টি হতে পারে কম্পন। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়সমূহ উৎসস্থল থেকে গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে ভূত্বকের ওপর এমন তীব্র চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে গড়ে ৫.৮ মেগাওয়াট (Mw) মাত্রার মাঝারি ধরনের ‘ঝড়জনিত ভূমিকম্প’ (Stormquake) অনুভূত হতে পারে।
এই গবেষণার আলোয় ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, মায়ানমার-থাইল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কাসহ সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে সাইক্লোন ও ভূকম্পীয় ঝুঁকির এক নতুন মাত্রা উন্মোচিত হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ বৃহৎ সাইবার হানার কবলে সনি; ২৫ লক্ষেরও বেশি গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস
কী এই ‘ঝড়জনিত ভূমিকম্প’ (Stormquake)?
সাধারণত টেকটনিক প্লেটের স্থানচ্যুতির কারণে ভূমিকম্প হলেও, ‘ঝড়জনিত ভূমিকম্প’ বা স্টর্মকোয়েক হলো বায়ুমণ্ডলীয় অতি-নিম্নচাপ এবং সমুদ্রের তলদেশে বিশাল তরঙ্গের আঘাতের ফলে সৃষ্ট এক বিশেষ ধরনের ভূকম্পীয় প্রক্রিয়া।
-
পদ্ধতি: অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় যখন সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ধাবিত হয়, তখন বায়ুমণ্ডলের চাপের তীব্র তারতম্য ঘটে। একই সঙ্গে মহাসাগরের বিশালাকার ঢেউ সমুদ্রের তলদেশে গভীর চাপ (Seafloor Loading) সৃষ্টি করে।
-
ভূগর্ভস্থ কম্পন: এই চাপ সমুদ্রের তলদেশের ভূত্বকে শক্তির অনুকম্পন তৈরি করে, যা মাটির গভীরে থাকা ফল্ট লাইনে আঘাত হানে। ফলে মূল ঘূর্ণিঝড়টির পথজুড়েই মাঝারি মাত্রার (প্রায় ৫.৮ Mw) কম্পন ছড়িয়ে পড়ে।
দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ঝুঁকি
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলটি বিশ্বজুড়ে উষ্ণমণ্ডলীয় সাইক্লোনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় থাকা দেশগুলির জন্য এই প্রাকৃতিক পরিক্রমা এক যৌথ দুর্যোগের সৃষ্টি করতে পারে:
-
ভারত ও বাংলাদেশ: বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলিতে তীব্র সাইক্লোন আছড়ে পড়ার সময় সমুদ্রতলের প্রবল তরঙ্গ ও ফল্ট লাইনের অস্থিরতায় ভূকম্পীয় তরঙ্গ উৎপন্ন হতে পারে।
-
মায়ানমার ও থাইল্যান্ড: আন্দামান সাগর ও সংলগ্ন সমুদ্রীয় ফল্ট লাইনগুলিতে ঝড়জনিত এই চাপের কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
-
শ্রীলঙ্কা: বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তের এই দ্বীপাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের বায়ুমণ্ডলীয় নিম্নচাপ সমুদ্রতলে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
-
হিমালয় অঞ্চল (নেপাল): উপকূলীয় ঝড় সরাসরি নেপালে আঘাত না করলেও, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা তীব্র নিম্নচাপ ও সাইক্লোনের কারণে ভারত-নেপাল সীমান্তে সঞ্চিত ভূগর্ভস্থ শক্তিতে পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে মনে করছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা।
কেন বাড়ে বিপদের আশঙ্কা?
উপকূলবর্তী এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবের সঙ্গে যদি মাঝারি মাত্রার (৫.৮ Mw) ভূকম্পন যুক্ত হয়, তবে তার পরিণতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে: ১. উপকূলীয় পরিকাঠামো ধ্বংস: ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র হাওয়া এবং জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে মাঝারি ভূকম্পন ঘটলে দুর্বল বাড়িঘর, বাঁধ ও পুল সহজেই ধসে পড়তে পারে। ২. ধসের ঝুঁকি: পার্বত্য বা উপকূলবর্তী উঁচু এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের সাথে ভূকম্পন যুক্ত হলে ভয়াবহ ধস (Landslide) নামার সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ৩. উদ্ধারকার্যে বাধা: ঝড় ও ভূমিকম্পের জোড়া ধাক্কায় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা ও উদ্ধারকাজ ব্যাহত হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ অন্ধ্র উপকূলে ১৫০ কিমি বেগে আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’; লন্ডভন্ড একাধিক এলাকা
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা
বিজ্ঞানীদের মতে, ‘ঝড়জনিত ভূমিকম্প’ কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়, বরং আধুনিক আবহাওয়া ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞানের (Geophysics) এক প্রতিষ্ঠিত গবেষণালব্ধ সত্য। তাই বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা জারি করার সময় আবহাওয়াবিদ ও আবহাওয়া দপ্তরের পাশাপাশি ভূ-বিজ্ঞানীদেরও সমুদ্রতলে ও উপকূলীয় ফল্ট লাইনগুলিতে সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। উপকূলীয় অঞ্চলের পরিকাঠামো নির্মাণের সময় ঘূর্ণিঝড়ের ঝোড়ো হাওয়ার পাশাপাশি এই ধরনের মধ্যম মাত্রার ভূকম্পীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা রাখারও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


