বিশেষ ভ্রমণ ও ধর্মীয় ঐতিহ্য প্রতিবেদন:
হাওড়া জেলার বাগনান স্টেশন থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত শতবর্ষ প্রাচীন ও ঐতিহ্যে ঘেরা এক পুণ্যতীর্থ—খালোড় কালীবাড়ি। প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছরের প্রাচীন এই মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা দক্ষিণাকালী কেবল স্থানীয় খালোড় বা বাগনান অঞ্চলের মানুষের কাছেই নন, বরং সমগ্র হাওড়া জেলা ও ভিন্ন রাজ্যের হাজার হাজার ভক্তের কাছে এক পরম জাগ্রত ও জীবন্ত প্রতীক। বাগনান অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুযায়ী, যেকোনো শুভ কাজের সূচনা আজও এই মায়ের অনুমতি ও আশীর্বাদ নিয়ে করা হয়।
রাজা কন্দর্প নারায়ণের স্বপ্নাদেশ ও আদি মূর্তির ইতিহাস
ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুসন্ধান করলে জানা যায়, প্রাচীনকালে এই সমগ্র ভূখণ্ড বর্ধমান রাজবাড়ির জমিদারির অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে প্রমত্তা দামোদর নদ মন্দির এলাকা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে সরে গেলেও, তৎকালীন সময়ে দামোদর বহমান ছিল এই মন্দিরের গা ঘেঁষেই।
-
স্বপ্নাদেশ ও স্থায়ী প্রতিষ্ঠা: বর্ধমানের মহারাজা কন্দর্প নারায়ণ স্বয়ং নিজের জমিদারি তদারকি করতে এখানে আসতেন এবং প্রতি বছর কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে মা কালীর পুজো দিয়ে দেবীমূর্তি বিসর্জন দিয়ে ফিরে যেতেন। জনশ্রুতি রয়েছে, একবার মহারাজা দেবী দক্ষিণাকালীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে প্রতি বছর বিসর্জন না দিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন। মায়ের আদেশ পেয়ে দামোদরের তীরেই দেবীর এক বিশাল ৮ ফুট উচ্চতার আদি মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন মহারাজা।
১৩৪৭ বঙ্গাব্দের অলৌকিক ঘটনা ও বর্তমান নিমকাঠের মূর্তি
কালের নিয়মে সেই আদি মূর্তিটি ভগ্ন হতে শুরু করলে, ১৩৪৬-৪৭ বঙ্গাব্দ নাগাদ মন্দিরের তৎকালীন পুরোহিত মন্মথনাথ গাঙ্গুলী দেবীর দ্বিতীয় স্বপ্নাদেশ লাভ করেন। দেবীর নির্দেশ ছিল—আদি মূর্তিকে ত্রিবেণীতে বিসর্জন দিয়ে পার্শ্ববর্তী বোয়ালিয়া (বোর) গ্রাম থেকে একটি নির্দিষ্ট নিমগাছ কেটে এনে নতুন বিগ্রহ নির্মাণ করতে হবে।
-
দারুশিল্পীর হাতে রূপদান: স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী দামোদরের সঙ্গে যুক্ত খাল বেয়ে নিমকাঠ ভাসিয়ে আনা হয়। শ্যামপুরের প্রখ্যাত দারুশিল্পী গণেশচন্দ্র খাঁড়া সেই নিমকাঠ খোদাই করে তৈরি করেন দেবীর বর্তমান মনোহরী বিগ্রহ।
-
প্রতিষ্ঠা দিবস পালন: ১৩৪৭ বঙ্গাব্দের ৩২শে আষাঢ় (আষাঢ় মাসের শেষ দিন) মহা সমারোহে এই নতুন মূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি বহন করে আজও প্রতি বছর আষাঢ় সংক্রান্তিতে ধুমধাম করে মায়ের ‘প্রতিষ্ঠা দিবস’ বা ‘জন্মদিন’ উদযাপন করা হয়।
পাল যুগের বিষ্ণুমূর্তি ও পঞ্চরত্ন স্থাপত্য
খালোড় কালীবাড়ির প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেবল কালীমূর্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মন্দির প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত রয়েছে পাল যুগের একটি দুর্লভ কষ্টিপাথরের প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি এবং ছ’টি পাথরের কূর্ম (কচ্ছপ) মূর্তি—যা মন্দিরটির সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের জোরালো সাক্ষ্য দেয়।
-
স্থাপত্যের রূপান্তর: শুরুর দিকে এটি একটি একরত্ন মন্দির হলেও পরবর্তীকালে সংস্কারের মাধ্যমে বর্তমানের চমৎকার ‘পঞ্চরত্ন’ মন্দিরের রূপ দেওয়া হয়েছে।
-
অন্যান্য দেব-দেবী: মন্দির চত্বরেই অবস্থান করছে বাণেশ্বর শিব, মৃত্যুঞ্জয় শিব, শীতলা মাতা এবং জগদ্ধাত্রী মায়ের পৃথক মণ্ডপ।
আরও পড়ুনঃ শ্রীপতিপুরে ৭৩ বছর ধরে পূজিতা দেবী ‘সবুজ কালী’, বাঁশির সুরে তুষ্ট হন মা! হুগলির হরিপালে আরাধনা বৈষ্ণব ও শাক্তের এক অনন্য মেলবন্ধন
বলিপ্রথা, পঞ্চম ব্যঞ্জন ভোগ এবং অভিনব মেলা
খালোড় কালীবাড়িতে প্রতিদিন নিয়ম করে মা কালীর নিত্যপুজোর পাশাপাশি পঞ্চম ব্যঞ্জনে অন্নভোগ নিবেদন করা হয় (ভোগ পাওয়ার জন্য সকাল ৯টার মধ্যে বুকিং করতে হয়)। ভক্তদের মানসিক পূরণের জন্য মন্দিরে আজও প্রাচীন বলিপ্রথা বজায় রয়েছে।
মন্দিরটিকে কেন্দ্র করে বছরভর অত্যন্ত অভিনব কিছু মেলা আয়োজিত হয়:
-
তাল-কালীর মেলা: ভাদ্র মাসের কৌশিকী অমাবস্যায় তালের বিশেষ উপাচার দিয়ে মায়ের পুজো হয় এবং এই উপলক্ষে বিখ্যাত ‘তাল-কালীর মেলা’ বসে।
-
মুলো-কালীর মেলা: পৌষ মাসের অমাবস্যা তিথিতে মুলো দিয়ে মায়ের বিশেষ আরাধনা করা হয়, যা লোকমুখে ‘মুলো-কালীর মেলা’ নামে পরিচিত।
গমনপথ (কীভাবে পৌঁছাবেন):
-
রেলপথে: হাওড়া স্টেশন থেকে মেদিনীপুর, খড়গপুর কিংবা পাঁশকুড়াগামী যেকোনো লোকাল ট্রেনে উঠে বাগনান স্টেশনে নামতে হবে। স্টেশন থেকে মন্দিরের দূরত্ব মাত্র ১.৩ কিলোমিটার। স্টেশন চত্বর থেকে টোটো বা অটোতে চেপে সহজেই সরাসরি খালোড় কালীবাড়িতে পৌঁছানো যায়।
-
সড়কপথে: নিজস্ব গাড়ি বা বাইকে যেতে চাইলে ১৬ নম্বর জাতীয় সড়ক (মুম্বাই রোড) ধরে বাগনান মোড় হয়ে খালোড় গ্রামের দিকে এগোলেই সহজেই পৌঁছানো যায় এই ঐতিহাসিক মন্দিরে।


