বিশেষ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক প্রতিবেদন:
আজকের ঝলমলে দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়াহাট, মনোহরপুকুর এবং পূর্ণদাস রোড—চারদিকে বড় বড় শপিং মল, বহুতল ও কর্মব্যস্ত রাজপথ। কিন্তু আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে এই পুরো অঞ্চলটিই ছিল ঘন হোগলাবন, জলাভূমি ও ভয়াল জঙ্গলে ঘেরা। আর সেই জঙ্গলেই রাজত্ব করত এক ত্রাস—দুর্ধর্ষ ডাকাতসর্দার মনোহর বাগদি, যিনি লোকমুখে পরিচিত ছিলেন মনোহর ডাকাত নামে।
কালীঘাটের পুণ্যার্থী থেকে শুরু করে আদি গঙ্গার নদীপথের বণিক—মনোহরের দলের নাম শুনলেই শিউরে উঠত সবাই। কিন্তু এই নিষ্ঠুর ডাকাত সর্দারের জীবন ও আরাধনার নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল এমন এক অদ্ভুত প্রথা ও গল্প, যা আজকের দিনেও কৌতূহল জাগায়।
কুয়োর জলে কালীমূর্তি: অদ্ভুত আরাধনা ও ‘ছানা কালী’
মনোহর ডাকাতের আরাধ্যা ছিলেন এক কষ্টিপাথরের অতি ক্ষুদ্র কালীমূর্তি। আকারে অত্যন্ত ছোট হওয়ায় লোকমুখে দেবী পরিচিত হন ‘ছানা কালী’ নামে। কিন্তু দেবীর পূজার যে পদ্ধতি মনোহর পালন করত, তা ছিল রীতিমতো চমকপ্রদ:
-
পাতকুয়োয় বিসর্জন সদৃশ গোাপনীয়তা: জনশ্রুতি বলে, ডাকাতদল নিয়ে অভিযানে বেরোনোর ঠিক আগে মনোহর সেই কষ্টিপাথরের কালীমূর্তির গায়ে শক্ত করে দড়ি বাঁধত। তারপর নিজের আরাধ্যা দেবীকে ডেরার পাশের অন্ধকার পাতকুয়োর জলে ডুবিয়ে রেখে অভিযানে চলে যেত।
-
সফল হয়ে প্রত্যাবর্তন ও পূজা: ডাকাতি সেরে নিরাপদে ফিরে আসার পর আবার দড়ি টেনে মূর্তিটিকে পাতকুয়া থেকে তুলে এনে শুদ্ধাচারে ধূপ-দীপ জ্বালিয়ে পুজো করা হতো।
কিন্তু কেন এই অদ্ভুত কাণ্ড?
ঐতিহাসিক তথ্য অপেক্ষা লোকবিশ্বাসের প্রাধান্যই এতে বেশি। প্রচলিত রয়েছে যে, নিজের পরমারাধ্যা দেবীকে শত্রু, প্রতিদ্বন্দ্বী ডাকাতদল কিংবা পুলিশের চোখের আড়ালে রাখতেই এমন চরম গোপনীয়তার আশ্রয় নিত সে। আবার অনেকের মতে, অভিযানের সময় দেবী যাতে সম্পূর্ণ ‘সুরক্ষিত’ ও ‘গুপ্ত’ থাকেন, তাই এই ব্যবস্থা।
স্বপ্নাদেশ ও উদ্ধার: কামাখ্যাচরণ মুখোপাধ্যায়ের অবদান
মনোহর ডাকাতের মৃত্যুর পর বহু বছর পার হয়ে যায়। সেই পাতকুয়োর কথা মানুষ ভুলে গেলেও লোককথা বলে, বহু কাল পর কামাখ্যাচরণ মুখোপাধ্যায় নামে এক সাধক ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি স্বপ্নে দেবীর দর্শন পান। দেবী নাকি তাঁকে জানান, তিনি বহু যুগ ধরে এক অন্ধকার কুয়োর তলদেশে বন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছেন।
সেই স্বপ্নাদেশের সূত্র ধরেই কুয়োর জল সেচে উদ্ধার করা হয় সেই ঐতিহাসিক কষ্টিপাথরের ‘ছানা কালী’ মূর্তি। পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্দির নির্মাণ করে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ডাকাত থেকে পিতা: এক অনাথ শিশু ও মনোহরের রূপান্তর
ভয়াল ডাকাত মনোহরের জীবনে পরম আধ্যাত্মিক ও মানবিক পরিবর্তন এনেছিল একটি বিশেষ ঘটনা।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, একবার জঙ্গলে এক বাঘের আক্রমণ থেকে এক অসহায় মহিলা ও তাঁর শিশুপুত্রকে নিজের প্রাণ বাজি রেখে উদ্ধার করে মনোহর। মারাত্মক জখম হওয়ায় মহিলাটিকে বাঁচানো না গেলেও, সেই অনাথ শিশুটির প্রতি এক অজানা পিতৃস্নেহে ব্যাকুল হয়ে পড়ে ভয়ংকর ডাকাতসর্দার। শিশুটির নাম রাখা হয় ‘হারাধন’।
হারাধনকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই মনোহরের কঠোর ও নিষ্ঠুর হৃদয় ধীরে ধীরে মোমের মতো গলে যায়। অপরাধের জগতকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে ফিরে আসে মনোহর।
আরও পড়ুনঃ ৪০০ বছরের পুরোনো জাগ্রত দেবী দক্ষিণাকালী; বাগনানের ঐতিহ্যবাহী খালোড় কালীবাড়ি
আজকের পূর্ণদাস রোড ও মনোহরপুকুরের স্মৃতি
আজও দক্ষিণ কলকাতার পূর্ণদাস রোডে সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে মনোহর ডাকাতের স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহ্যবাহী কালীমন্দির। মন্দিরের ফলকে প্রতিষ্ঠার সাল লেখা রয়েছে ১৮৯১। পাতকুয়োয় দেবীমূর্তি লুকিয়ে রাখা কিংবা স্বপ্নাদেশের কাহিনীগুলি লোকশ্রুতি ও লোকবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও, এই ইতিহাস কলকাতার অতীত ঐতিহ্যের এক অমূল্য উপাদান।
যে ডাকাত একসময় নিজের দেবীকে রক্ষা করতে পাতকুয়োর অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখত, শেষ পর্যন্ত এক কুড়িয়ে পাওয়া অনাথ শিশুর মমতাই তার অন্ধকার জীবনে আলোর দিশা দেখিয়েছিল। সত্যিই, দেবীকে কুয়োর জলে ঢেকে রাখা সহজ, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জেগে ওঠা চিরন্তন ভালোবাসাকে কোনোদিন লুকিয়ে রাখা যায় না!


