কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
ডুয়ার্সের জীববৈচিত্র্যে ফের এক বিরল অতিথির দেখা মিলল। জলপাইগুড়ি শহর সংলগ্ন মোহিত নগর এলাকায় ফের উদ্ধার হলো অত্যন্ত দুর্লভ, সুন্দর ও সম্পূর্ণ নির্বিষ প্রজাতির ‘রেড কোরাল কুকরি’ (Red Coral Kukri) সাপ। বারবার এই নির্দিষ্ট এলাকায় এই প্রজাতির সাপ উদ্ধার হওয়ায় বন্যপ্রাণপ্রেমী ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনই ওই অঞ্চলে বনদপ্তরের লাগাতার ও কড়া নজরদারির জোরালো দাবি উঠেছে।
আরও পড়ুনঃ ডুয়ার্সে চিতাবাঘের সঙ্গে কাঁচি হাতে অসম লড়াই ৬০ বছরের বৃদ্ধা বাসন্তী রায়ের!
১. কীভাবে উদ্ধার হলো সাপটি?
রবিবার জলপাইগুড়ি অরবিন্দ পঞ্চায়েতের মোহিত নগর এলাকার এক বাসিন্দার বাড়ির গাছের গুঁড়ির সঙ্গে সাপটিকে পেঁচিয়ে থাকতে দেখা যায়।
-
উদ্ধারকারী বিশ্বজিৎ দত্ত চৌধুরী: স্থানীয় বাসিন্দারা সাপটিকে দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে খবর দেন এলাকার প্রবীণ ও বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী বিশ্বজিৎ দত্ত চৌধুরী-কে।
-
নিরাপদ মুক্তি: খবর পাওয়া মাত্রই তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সাপটিকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে কোনো রকম ক্ষতি না করে উপযুক্ত ও নিরাপদ প্রাকৃতিক জঙ্গলেই সেটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
২. বিগত ১৫ বছরে ২৫টি রেড কোরাল কুকরি উদ্ধার: বিশ্বজিৎবাবুর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা
জলপাইগুড়ির পরিবেশকর্মী মহল সূত্রে জানা গিয়েছে, রেড কোরাল কুকরি সাপের মতো এমন অতি বিরল প্রজাতি এর আগেও একাধিকবার এই অঞ্চল থেকে উদ্ধার হয়েছে।
-
বিশেষ রেকর্ড: গত ১৫ বছরের মধ্যে জলপাইগুড়ি জেলা থেকে অন্তত ২৫টি রেড কোরাল কুকরি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। যার সিংহভাগই উদ্ধার হয়েছে জলপাইগুড়ি শহর সংলগ্ন মোহিত নগর, বিলপাড়া, বেলাকোবা এবং শিরিষতলা এলাকা থেকে।
-
৪০ বছরের সাধনা: বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী বিশ্বজিৎ দত্ত চৌধুরী গত প্রায় ৪০ বছর ধরে বন্যপ্রাণ ও সাপ উদ্ধারের কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি প্রায় ২৫টি রেড কোরাল কুকরি সাপ উদ্ধার করেছেন, যার একটি বিরাট অংশই মোহিত নগর এলাকা থেকে উদ্ধার করা। এই দুর্লভ সাপটির আচরণ ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে তাঁর প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা তিনি প্রয়োজনে বনদপ্তরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে আগ্রহী।
আরও পড়ুনঃ প্রবল তুষারপাতে বিপত্তি, নেপালে আটকে ৪ বাঙালি-সহ ছয় ভারতীয়
৩. রেড কোরাল কুকরি সাপের বৈশিষ্ট্য ও খাদ্যাভ্যাস
প্রকৃতিবিদ ও পরিবেশকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বিরল সাপটির কিছু সুনির্দিষ্ট ও আকর্ষণীয় শারীরিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
-
স্বভাব ও বিষহীনতা: এই সাপ সম্পূর্ণভাবে নির্বিষ প্রকৃতির হয়। এরা স্বভাবগতভাবে অত্যন্ত লাজুক এবং মাটির নিচে গর্ত খুঁড়ে বা মাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকতে বেশি ভালোবাসে।
-
বেরিয়ে আসার কারণ: মূলত বর্ষাকালে বা অতিরিক্ত বৃষ্টির সময়ে যখন মাটির নিচের গর্তগুলিতে জল জমে যায়, তখন বাধ্য হয়েই এরা বাইরে বেরিয়ে আসে।
-
খাদ্যাভ্যাস: অন্যান্য সাপের মতো এদের খাদ্যতালিকায় প্রধানত ব্যাঙ থাকে না। এরা মূলত কেঁচো বা বিভিন্ন পোকার লার্ভা খেয়ে বেঁচে থাকে।
-
আকার: এই প্রজাতির পূর্ণাঙ্গ সাপ সাধারণত লম্বায় প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এদের গায়ের উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় রঙ যে কাউকেই সহজে মুগ্ধ করে।
মোহিত নগর এলাকায় বারবার এই বিরল সাপের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে ওই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র এখনও অনেকখানি ভারসাম্যপূর্ণ। তবে বারবার লোকালয়ে এই সাপ চলে আসার কারণে পরিবেশকর্মীরা বনদপ্তরকে ওই এলাকায় বিশেষ নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।


