ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝির বিশেষ অনুরোধে বাংলায় এসেছিলেন বিজেপি সাংসদ সম্বিৎ পাত্র। মুখ্যমন্ত্রী একটি বিশেষ চিঠিতে লিখেছেন দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের ধাম শব্দে আহত হয়েছেন ওড়িশার মানুষ। তাই তিনি চান বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ওই ধাম শব্দ বন্ধটি প্রত্যাহার করুন। শুভেন্দু অধিকারী রীতিমত সাংবাদিক বৈঠক ডেকে এই ধাম শব্দটি প্রত্যাহার করার কথা বলেন।
পুরীর নবনির্বাচিত বিজেপি সাংসদ সম্বিত পাত্র ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়ে আজ নবান্নে আসেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাতে ওড়িশা সরকারের সেই অফিসিয়াল চিঠিটি তুলে দেন। চিঠিতে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সনাতন ধর্মে ‘চার ধাম’-এর অন্যতম হলো পুরীর শ্রীজগন্নাথ ক্ষেত্র।
দিঘার মন্দিরটিকে পূর্ববর্তী সরকার যেভাবে ‘জগন্নাথ ধাম’ হিসেবে প্রচার ও চিহ্নিত করেছিল, তাতে ওড়িশার কোটি কোটি জগন্নাথ ভক্তের ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তাই ‘ধাম’ শব্দটি বাদ দিয়ে এটিকে শুধুমাত্র ‘জগন্নাথ মন্দির’ রাখার অনুরোধ করা হয়।ওড়িশা সরকারের এই আবেগকে সম্মান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্যাবিনেটের সাথে আলোচনার পর আজই সাংবাদিক বৈঠকে ঘোষণা করেন, দিঘার ওই স্থানকে ‘ধাম’ বলা শাস্ত্রসম্মত নয়। তাই অবিলম্বে ‘ধাম’ তকমা তুলে নেওয়া হলো এবং এটি এখন থেকে সাধারণ নিয়ম মেনে শুধুই ‘দিঘা জগন্নাথ মন্দির’ হিসেবে পরিচিত হবে।
আরও পড়ুনঃ নিখুঁত টাইমিং, চরম পলিটিক্যাল ট্র্যাপ! সংসদেও ভাঙল তৃণমূল
প্রথম থেকেই এই মন্দির নিয়ে ছিল নানা রকম বিতর্ক। তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপি বারবার এই বিষয়ে প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছিল যে হিন্দু ধর্মে চার ধাম ব্যাতিত অন্য কোনও ধাম হয় না। তাই দিঘার এই মন্দিরের নাম কোনোভাবেই ধাম নয়। তবে এই বিতর্কে কর্নপাত করেন নি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। তিনি ওই ধাম শব্দটি ব্যবহার করেন। সেই সময় ওড়িশার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল তবে সরকারের প্রভাবের কারণে কোনো অ্যাকশন নেওয়া যায়নি। রাজ্যে পালা বদলের পরেই এই পরিবর্তন নিয়ে ফের সরব হয়েছেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী এবং এই পরিবর্তনকে স্বীকার করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
নতুন নামকরণ ও পুজোর নিয়মাবলি
রাজ্য প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের পরিচিতি ও পুজো অর্চনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দিঘার এই মন্দিরটিকে এখন থেকে আর ‘জগন্নাথ ধাম’ বলা হবে না। এর নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘শ্রী শ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’। নামের বদল ঘটলেও মন্দিরের প্রাত্যহিক ধর্মীয় রীতিনীতিতে কোনও প্রভাব পড়বে না। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনেই প্রতিদিন সেখানে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে জগন্নাথ দেবের পুজো সম্পন্ন হবে এবং নিত্যদিনের পুজো-অৰ্চনায় কোনও রকম ছেদ পড়বে না।
দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে কেন ‘ধাম’ বলা হচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে বিতর্ক চলছিল বহু দিন ধরেই।কিন্তু কেন দিঘার নবনির্মিত মন্দিরকে ‘ধাম’ বলা শাস্ত্র বা অভিধানসম্মত নয়? এবার সেই নেপথ্য কারণ ও আভিধানিক ব্যাখ্যাটি স্পষ্ট করেন মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘‘ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী পুরীর সাংসদ সম্বিতকে পাঠিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, সকলেই চান ওখানে নিয়ম মেনে পুজোপাঠ হোক। কিন্তু ‘ধাম’ শব্দ সনাতন সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’’ এই নামকরণের বিরোধিতাকে মান্যতা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘বিতর্ক আগেই ছিল। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব গ্রহণ করে দিঘার ওই ক্যাম্পাস থেকে ধাম শব্দ সরিয়ে দিচ্ছি।’’
ভাষা ও শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ‘ধাম’ শব্দটির একটি গভীর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে, যা দিঘার এই মন্দিরের ক্ষেত্রে কোনওভাবেই মেলে না। বিভিন্ন অভিধান অনুসারে, ‘ধাম’ শব্দের মূল অর্থ হলো তীর্থস্থান বা আবাস (বাসস্থান)। এই আবাস সাধারণ মানুষেরও হতে পারে, যেমন— ‘মাতৃধাম’। আবার তা দেবতার নামেও হতে পারে, যেমন— ‘গোলকধাম’।
তবে সাধারণ আবাসের গণ্ডি পেরিয়ে কোনও স্থানকে প্রকৃত ‘তীর্থস্থান’ হয়ে উঠতে গেলে, সেখানে সংশ্লিষ্ট দেবতা বা কোনও মহাপুরুষের লীলা কিংবা অধিষ্ঠানক্ষেত্র হওয়া বাধ্যতামূলক। দিঘার ক্ষেত্রে তেমন কোনও ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক ভিত্তি নেই। অনেকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘ধাম’ কথার অর্থ হল তেজ বা জ্যোতি। এ প্রসঙ্গে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে— “জয়তি কনকঃ ধামা কৃষ্ণ চৈতন্য নামে”। অর্থাৎ, তেজোদ্দীপ্ত কেউ কোথাও জন্মগ্রহণ করলে কিংবা কোনও স্থান প্রতিষ্ঠা করলে তবেই সেটি ‘ধাম’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই সংজ্ঞার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল নদিয়ার নবদ্বীপ। সেখানে শ্রীচৈতন্যদেবের জন্ম হয়েছিল, তাই সেটি ‘ধাম’ হিসেবে পুজিত।
শাস্ত্র ও অভিধানের এই অকাট্য নিয়মের নিরিখে বিচার করলে দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে কোনওভাবেই ‘ধাম’ বলা যায় না। এই যুক্তিপূর্ণ প্রশ্নটিই এদিন আড়ালে না রেখে জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। আর সেই কারণেই সনাতন সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে দিঘার ওই প্রকল্প থেকে ‘ধাম’ শব্দটি ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল নতুন রাজ্য সরকার।


