বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রযুক্তির বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করতে চীন দীর্ঘদিন ধরেই রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে সামনে রাখছে। সরকারি প্রচারে যাকে বলা হচ্ছে অ্যান্টি স্টেলথ এয়ার সার্ভিলেন্স সিস্টেম, বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে ফের গুরুতর প্রশ্ন উঠল। পাকিস্তানের পর এবার ভেনেজুয়েলায় চীনা রাডারের ব্যর্থতার অভিযোগ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলে আলোচনার কেন্দ্রে।
আরও পড়ুনঃ হাভানা থেকে কড়া বার্তা! ভেনেজুয়েলার পাশে রক্ত দিতে প্রস্তুত কিউবা
সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত চীনা নির্মিত এস ব্যান্ড এয়ার সার্ভিলেন্স রাডার মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মার্কিন ড্রোন, ফাইটার জেট এমনকি হেলিকপ্টার পর্যন্ত কার্যত রাডারের চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। ট্র্যাকিং তো দূরের কথা, প্রাথমিক ডিটেকশনই সম্ভব হয়নি।
এই ঘটনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন সামরিক পর্যবেক্ষকরা। কারণ একই ধরনের রাডার সিস্টেম অতীতে পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা যায়। ভারতীয় ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ক্ষমতার সামনে সেই ব্যবস্থাও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছিল বলে দাবি। সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাডার নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে, যার ফল হিসেবে একাধিক বিমানঘাঁটি ও রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর আগেও সিরিয়ার দামাস্কাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আকাশ প্রতিরক্ষায় চীনা রাডারের ব্যর্থতার কথা শোনা গিয়েছিল। সেই সময়েও প্রশ্ন উঠেছিল, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে কি আদৌ ঘোষিত ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারছে এই প্রযুক্তি। ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা সেই পুরনো সন্দেহকেই যেন নতুন করে জোরালো করল।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সমস্যাটা শুধুমাত্র হার্ডওয়্যারের নয়। আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মানে শুধু শক্তিশালী রাডার বসানো নয়। তার সঙ্গে চাই নিরবচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ অপারেটর, শক্তিশালী কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক জ্যামিং মোকাবিলার ক্ষমতা। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই পুরো ইকোসিস্টেমটাই দুর্বল ছিল বলে মত অনেকের।
আরও পড়ুনঃ “আমি ল’ইয়ার আছি”; SIR ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টে নিজেই সওয়াল করবেন ‘আইনজীবী’ মমতা!
তবে অন্য একটি অংশ মনে করছে, চীনা প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও এখানে স্পষ্ট। অ্যান্টি স্টেলথ তকমা যতই জোরালো হোক, বাস্তবে স্টেলথ ড্রোন ও ফাইটারের বিরুদ্ধে কার্যকর ডিটেকশন আজও অত্যন্ত জটিল বিষয়। মার্কিন ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও সাইবার সাপোর্টের সামনে চীনা রাডার নেটওয়ার্ক কতটা টিকে থাকতে পারবে, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো মেলেনি।
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত বাস্তবতা নতুন করে আলোচনায়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে চীনা প্রযুক্তির উপর ভর করে প্রতিবেশী দেশের উচ্চাশা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও কটাক্ষ শুরু হয়েছে প্রতিরক্ষা মহলে। আধুনিক যুদ্ধে শুধু অস্ত্র কেনা যথেষ্ট নয়, সেটিকে বাস্তব পরিস্থিতিতে টিকিয়ে রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভেনেজুয়েলার আকাশে চীনা রাডারের এই অদৃশ্য ব্যর্থতা তাই শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়। এটি বেজিংয়ের সামরিক রপ্তানি কৌশল ও প্রযুক্তিগত দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিল। যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষায় পাশ না করলে কাগজে লেখা ক্ষমতা যে খুব বেশি মূল্য রাখে না, এই ঘটনা আবারও সেই কঠিন সত্যটাই মনে করিয়ে দিল।





