চন্দন দাস, কলকাতাঃ
১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া ভ্রমণের পর মুগ্ধতার আবেশে লিখেছিলেন এখানে না এলে তাঁর এ জন্মের তীর্থ দর্শন অসম্পূর্ণ থেকে যেতো। তাঁর বিস্ময়ের বিবরণ ‘রাশিয়ার চিঠি’র গুচ্ছতে বিধৃত আছে। এই রাশিয়াকে জার শাসনের পুঞ্জিভূত ক্লেশ ও অন্ধকার থেকে জীবনের আলোয় যিনি এনেছিলেন, তিনি ভি আই লেনিন। সফল বিপ্লব, সফল সোভিয়েত স্থাপন, জাতীয় অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, সমাজ বৈষম্যের অবসান এবং শিক্ষায় নতুন সূর্য কিরণ ••• একটি জীর্ণ , ভঙ্গুর, দারিদ্রে অবনত দেশকে নবজীবন দান এবং বিশ্বকে বিবেকবান সমাজের স্বপ্ন দেখান যিনি, তিনিই লেনিন। আজ লেনিনের জন্মবার্ষিকী (২২ এপ্রিল ১৮৭০) , অতুলনীয় প্রতিভা ও বিরল ব্যক্তিত্বের এই বিশ্ব বিপ্লবীকে তাই স্মরণ করি ইতিহাসের প্রতি কৃতজ্ঞতায়।
কলকাতার ধর্মতলা এসপ্ল্যানেডে দীর্ঘদেহী লেনিনের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিরল বীরত্বের একটি মুর্তি আছে, বামফ্রন্ট শাসনকালে যা প্রতিষ্ঠিত। মূর্তিটি মহান দার্শনিক, তাত্ত্বিক ও ইতিহাসের নির্মাতা লেনিনের উদ্দেশ্যে বঙ্গভূমের ও বাঙালির বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রণাম।
আরও পড়ুনঃ ভোটবঙ্গে সেন্সরশিপ! শ্রীজাতর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট
সোভিয়েতের পতনের পর এবং আমাদের দেশেও দক্ষিণপন্থার সাময়িক উত্থানে পুলকিত কিছু বঙ্গ পুঙ্গব পশ্চিম বাংলার নন্দীগ্রামে এবং কাটোয়ায় লেনিনের দুটি মূর্তির ক্ষতি করে এবং কলকাতার মূর্তিটি ধ্বংসের হুঙ্কার দিয়ে ভেবেছিল বাঙালির মনন থেকে তারা লেনিনকে নির্বাসনে পাঠাতে পারবে। এই অর্বাচীন এবং অপুংসকেরা, জানে না ইতিহাসের স্রোতস্বিনী ধারার গতি পাল্টানোর হিম্মত তাদের নেই। তারা জানে না মূর্তি ভেঙে আদর্শকে ভাঙা যায় না, ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের বুকে আবার দ্বিগুণ দীপ্তিতে জ্বলে ওঠে দৃপ্ত শপথের অঙ্গীকার।
অবিমৃষ্যকারীরা জানে না বাঙালির মননে হাতুড়ির ঘা মারেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর রাশিয়ার পত্রগুচ্ছকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে । তারা শোনেনি , এই মূর্তির দিকে চোখ রেখে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বলশালী এবং উদাত্ত উচ্চারণ ঃ
“লেনিন যেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন,
শতাব্দী শেষ হয়ে আসছে—
একটু পা চালিয়ে, ভাই,
একটু পা চালিয়ে।।”
শান্তিগোপালের লেনিন যাত্রাপালা বাঙালির স্মৃতিতে এখনও মশাল হয়ে জ্বলছে। বাগবাজারের শান্তিরাম পাল যাত্রার আসরে এসে হয়েছিলেন শান্তিগোপাল । তাঁর যাত্রাপালা দেখেছিলাম ‘লেনিন’ । আবেগে অনুপ্রেরণায় ঠক ঠক করে কাঁপতে দেখেছি দর্শকদের। ছুঁচ গলে না এমন ভিড়। তাঁর কন্ঠের সংলাপ যেন ক্ষুরধার তরবারির মতো আছড়ে পড়ছে , নির্বাক দর্শকমণ্ডলী কেবল করতালিতে মুখর হয়ে উঠেছে মাঝে মাঝে। শুনেছি ‘ লেনিন’ যাত্রা দেখে মুগ্ধ বাগ্মী জননেতা হরেকষ্ণ কোণার বলেছিলেন, ‘আমাদের দু’শোটা বক্তৃতায় যা হয় না, আপনার একটা নাটকে এক দিনে তা হয়।’
শুধু যাত্রা কেন, থিয়েটারের কথা ভুললে চলবে ?
উৎপল দত্তের নাটক ‘লেনিন কোথায়’, আজও আমাদের বিবেকে সাড়া জাগায়, সঙ্গে উমানাথ ভট্টাচার্যের ‘দিন বদলায়’, রমেন লাহিড়ীর ‘আমিই লেনিন’, তো আছেই। ঋত্বিক ঘটকও একসময় একটি ছোটো তথ্যচিত্র তৈরি করেন ‘আমার লেনিন’। সেটিও বাঙালির ভুলে যাওয়ার কথা নয়।
বাংলা তথা বাঙালি এভাবেই তার মননের মৃত্তিকায় লেনিনকে সঞ্জীবিত করে রেখেছে। তাঁর মূর্তি উপড়ে ফেলে তাঁর আদর্শ ও তত্ত্বের উৎপাটন তাই উন্মাদের দিবাস্বপ্ন , বাচালের বুজরুকি মাত্র। লেনিনকে বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর মর্মর মূর্তি বা মসোলিয়মের দরকার নেই। তিনি আছেন তাঁর তৈরি ইতিহাসের মাটিতে, তাঁর অভাবনীয় কৃতিত্বের কথায়, সোভিয়েতের সাফল্যে, গল্পে, গাথায়, লোকগানে, দরিদ্র সর্বহারার হৃদয়ের আলোকিত আসনে। সময় তাঁর স্মৃতিকে আবছা করতে পারেনি, ইতিহাস তাঁকে ভুলতে পারেনি, মৃত্যু তাঁকে মুছতে পারেনি, শাবল-কোদাল-গাঁইতি কাঁধে দুর্বৃত্তদের দুঃশাসনের ধূলিকণাও তাঁর মহিমাকে মলিন করতে পারবে না।
আরও পড়ুনঃ ‘সন্ত্রাসের কাছে মাথা নোয়াবে না ভারত’, পহেলগাঁও হামলার বর্ষপূর্তিতে কড়া বার্তা মোদীর
মনে পড়বেই বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা ঃ
“লেলিন শুধু লেনিন বলে লোকে
যেন শীতের আগুন হাতে লেনিন –
যেন চোখের জল শুকাতে লেনিন,
সে ছাড়া আর ঝড়ের রাতে কে ?
সমস্ত রাত পথ দেখাতে লেনিন। “
মনে পড়বেই সুকান্তের দৃঢ় প্রত্যয় ঃ
“দিকে দিকে কোণে কোণে লেনিনের পদধ্বনি
আজো যায় শােনা
দলিত হাজার কণ্ঠে বিপ্লবের আজো সম্বর্ধনা।”
মন হবেই ঃ
“বিপ্লব স্পন্দিত বুকে,
মনে হয় আমিই লেনিন।”
লেনিনের জন্মবার্ষিকীতে বঙ্গবার্তার কথাঞ্জলি



