সোশ্যাল মিডিয়া যে শিশু ও কিশোর মনে বড় রকমের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে এক মত গোটা বিশ্বের মনোবিদরা। পড়াশুনায় একাগ্রতা তো নষ্ট হচ্ছেই, কোনও কিছুতেই মন বসছে না অনেকের। সারাদিন মাইন্ডলেস রিলসে মজে রয়েছে কত শত শিশু, কিশোর, কিশোরী। তবে এর পরেও শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আনতে চাইছে না নরেন্দ্র মোদী সরকার। বরং বয়সভিত্তিক ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ আনতে চাইছে দিল্লি। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি সূত্রে খবর, ১৮ বছরের নিচে ব্যবহারকারীদের জন্য আলাদা নিয়ম তৈরির পরিকল্পনা চলছে। এই বিষয়ে একটি পৃথক আইন আনার কথাও ভাবা হচ্ছে, যা সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনে পেশ করা হতে পারে।
সরকারি সূত্র জানাচ্ছে, শিশুদের জন্য তিনটি আলাদা বয়সভিত্তিক বিভাগ বিবেচনা করা হচ্ছে—৮ থেকে ১২ বছর। ১২ থেকে ১৬ বছর। ১৬ থেকে ১৮ বছর। প্রতিটি বয়সের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের নিয়ম আলাদা হবে। এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্তা জানিয়েছেন, “সরকার কঠোর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে নয়। বরং বয়স অনুযায়ী সীমিত ও যুক্তিযুক্ত নিয়ন্ত্রণই বেশি কার্যকর হতে পারে।”
আরও পড়ুনঃ ইরান তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইলে নিষিদ্ধ ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহার করছে
আইটি মন্ত্রক ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বৈঠকে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সময়সীমা নির্ধারণ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে। যেমন—দিনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই লগ-ইন করার অনুমতি। সন্ধ্যা বা রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবহার। এছাড়াও, শিশুদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতি বাধ্যতামূলক করার কথাও ভাবা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়েই শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যেই শিশুদের জন্য কঠোর আইন চালু করেছে। ইন্দোনেশিয়া এই মাসেই ১৬ বছরের নিচে ব্যবহারকারীদের জন্য ইনস্টাগ্রামসহ কিছু প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সম্প্রতি ভারতকে ১৫ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার কথা ভাবতে বলেন।
সরকারি মহলের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর তথ্যও বাড়ছে। এর ফলে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, আচরণ এবং ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থনৈতিক সমীক্ষাতেও শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বয়সভিত্তিক সীমা ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছিল। সেখানে আরও বলা হয়েছিল, শিশুদের জন্য সাধারণ ফোন বা শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ট্যাব ব্যবহারের প্রচার করা উচিত।
আরও পড়ুনঃ বড় ধাক্কা ইরানের; আগদাসিয়েহ তেল ডিপোতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ভয়াবহ পরিণতি
তবে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির একাংশ মনে করছে, বিভিন্ন রাজ্য আলাদা আইন করলে তা বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি হবে। কর্ণাটক ১৬ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার কথা বলছে, আবার অন্ধ্রপ্রদেশে সীমা ১৩ বছর।
এক প্রযুক্তি সংস্থার কর্তার মতে, “রাজ্যভেদে আলাদা নিয়ম হলে তা কার্যকর করা কঠিন হবে। তাই কেন্দ্রীয় স্তরের একটি অভিন্ন আইনই বেশি বাস্তবসম্মত।”
অন্যদিকে ডিজিটাল অধিকার সংগঠনগুলির মতে, পুরো নিষেধাজ্ঞা সমস্যার সমাধান নয়। তাদের মতে, এতে শিশুদের তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাও সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় সমাজে মেয়েদের ডিজিটাল প্রবেশাধিকার কম। তাই কঠোর নিষেধাজ্ঞা ডিজিটাল লিঙ্গ বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রের কথায়, সম্ভাব্য আইনের ক্ষেত্রে সরকারের মূল লক্ষ্য হবে— “নাগরিকের নিরাপত্তা এবং শিশুদের সুরক্ষা।” এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থানও চাপিয়ে দেওয়া নয়। সরকার বিল আনার পর সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হবে। তার পর তা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞদের আরও পরামর্শ নিয়ে অভিন্ন আইন চালু হবে দেশ জুড়ে।





