তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ চলা সত্ত্বেও তিনি কেন এবং কীভাবে প্রতিবারই গ্রেফতারি এড়াতে সক্ষম হচ্ছেন, তা বোঝার জন্য ভারতের আইনি প্রক্রিয়া এবং তাঁর নিজস্ব কৌশলগুলো বিশদভাবে জানা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বিষয়টিকে “গ্রেফতারি এড়ানো” বলে দাবি করলেও, আইনি ও সাংবিধানিক দিক থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত বিচারবিভাগের সুরক্ষা এবং অত্যন্ত চতুর আইনি রণকৌশল ব্যবহার করে নিজেকে মুক্ত রেখেছেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রেফতার না হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো আদালতের তরফ থেকে পাওয়া আইনি রক্ষাকবচ।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূলের টিনের পার্টি অফিসে এসি-সোফা, উদ্ধার কন্ডোমের প্যাকেট!
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা, যেমন ED বা CBI, যখনই কোনো মামলায় তাঁকে সমন পাঠায় এবং গ্রেফতারের আশঙ্কা তৈরি হয়, তখনই তাঁর আইনজীবী দল অত্যন্ত তৎপরতার সাথে কলকাতা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।
সাম্প্রতিককালে নির্বাচনী বিতর্কিত মন্তব্য বা অন্যান্য প্রশাসনিক মামলার ক্ষেত্রেও হাইকোর্ট বারবার তাঁকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, তদন্ত চলবে, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ‘কঠোর পদক্ষেপ’ (Coercive Action) বা গ্রেফতারি করা যাবে না। এই আইনি ঢালই তাঁকে প্রতিবার রক্ষা করেছে।
আদালতের দেওয়া এই সুরক্ষাকবচ বজায় রাখার একটি প্রধান শর্ত হলো, তদন্তে সহযোগিতা করা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই শর্তটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেনে চলছেন।
তিনি তদন্ত এড়াতে পালিয়ে যাননি; বরং সিবিআই বা ইডি যখনই ডেকেছে, তিনি সশরীরে হাজির হয়েছেন। বহুবার ৫ থেকে ১১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অংশ নিয়েছেন।
আইনিভাবে তিনি দেখাতে পেরেছেন যে তিনি কোনো সমন অমান্য করছেন না। ফলে, তদন্তকারী সংস্থাগুলো আদালতের কাছে গিয়ে দাবি করতে পারছে না যে “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পলাতক বা অসহযোগিতা করছেন,” যা তাঁর গ্রেফতারির সম্ভাবনাকে অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
আইন অনুযায়ী, কাউকে গ্রেফতার করে হেফাজতে নিয়ে জেরা করতে হলে তদন্তকারী সংস্থাকে আদালতের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে, সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য মিলছে না এবং হেফাজতে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
অনেক সময় তদন্তকারীরা দাবি করেন যে নির্দিষ্ট কোনো নথিপত্র বা প্রমাণ উদ্ধারের জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে হেফাজতে নেওয়া দরকার।
কিন্তু আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, কোনো নথি খোঁজার জন্য সংস্থার কাছে ‘তল্লাশি ও বাজেয়াপ্ত’ (Search and Seizure)-এর ক্ষমতা রয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ২০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে প্রমাণ দিতে বা নথি পেশ করতে বাধ্য করা যায় না (Right against self-incrimination)। তাই শুধুমাত্র নথি উদ্ধারের অজুহাতে তাঁকে গ্রেফতার করার আবেদন আদালত গ্রাহ্য করেনি।
যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অকাট্য তথ্য-প্রমাণ মিলছে বা তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, ততক্ষণ বিচারাধীন অবস্থায় তাঁর ব্যক্তি-স্বাধীনতা খর্ব করা যায় না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবীরা আদালতে বারবার প্রমাণ করেছেন যে তাঁর পালিয়ে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই এবং তিনি স্থানীয় সমাজ ও রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো বেআইনি উপায়ে তদন্ত এড়াচ্ছেন না। বরং, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর সমন জারি করার সাথে সাথেই উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া এবং আদালতের রক্ষাকবচ নিয়ে নিজে সশরীরে তদন্তকারীদের মুখোমুখি হওয়া—এই দ্বিমুখী কৌশলেই তিনি প্রতিবার নিজেকে গ্রেফতারির হাত থেকে সুরক্ষিত রাখছেন।
আজ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি হাই-প্রোফাইল নির্বাচনী উস্কানিমূলক মন্তব্য বা বিদ্বেষমূলক ভাষণ (Hate Speech) মামলায় রাজ্য সিআইডি-র সদর দফতর ভবানী ভবনে হাজিরা দেওয়ার কথা রয়েছে।
বাগুইআটি থানায় দায়ের হওয়া একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানার কাছ থেকে সিআইডি এই মামলার তদন্তভার নিজেদের হাতে নেয়।
নির্বাচনী প্রচারের সময় দেওয়া বিতর্কিত বক্তব্য, বিশেষ করে ৪ মে “ডিজে বাজবে” সংক্রান্ত যে মন্তব্য তিনি করেছিলেন, সেই বিষয়ে তদন্তকারীরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এই মন্তব্যের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ভোট-পরবর্তী হিংসার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
জনসভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করে উস্কানিমূলক ও উগ্র মন্তব্য করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা-ও এই তদন্তের আওতাভুক্ত।
সিআইডি আজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে সোশ্যাল মিডিয়ার লিঙ্ক এবং বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরতে পারে এবং এই মন্তব্যের পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বা প্রেক্ষাপট নিয়ে তার বয়ান রেকর্ড করতে পারে।
আরও পড়ুনঃ ‘বাড়িতে সময় কাটছে না…’, মমতা হাইকোর্টে আসতেই খোঁচা
রাজনৈতিক ও আইনি চাপ থাকা সত্ত্বেও, আজই তার গ্রেফতার হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কলকাতা হাইকোর্ট অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোনো কঠোর পদক্ষেপ, যেমন গ্রেফতারি, থেকে শর্তসাপেক্ষ অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিয়েছে। তবে হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, এই সুরক্ষা বজায় থাকবে শুধুমাত্র তখনই, যদি তিনি তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেন।
গত ৪৮ ঘণ্টায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে একাধিক কেন্দ্রীয় ও রাজ্য তদন্তকারী সংস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যার পর আজকের এই জিজ্ঞাসাবাদ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ!
যেহেতু সিআইডি একই সাথে দুটি সমান্তরাল মামলার (সই জালিয়াতি এবং বিদ্বেষমূলক ভাষণ) তদন্ত করছে, তাই আজ, মূলত তার নির্বাচনী বক্তব্যের পেছনের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখার ওপরই কেন্দ্রীভূত থাকবে। আজকের এই জিজ্ঞাসাবাদকে কেন্দ্র করে ভবানী ভবনের চারপাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে।


