এক নজরে ম্যাচের ছবি বিশ্বকাপের উৎসব মেটার পর কলকাতার নজর আবার ফিরেছিল ময়দানের ফুটবলে। মরসুমের প্রথম ডার্বি ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই ছিল উন্মাদনা। দল কেমন গড়ে উঠেছে, তা মেপে নেওয়ার সেরা মঞ্চ ছিল মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল মুখোমুখি লড়াই। কিন্তু মাঠে নেমে পাওয়া গেল কেবলই হতাশা। বোঝার মতো ফুটবল উপহার দিতে পারল না কোনো দলই। আরও এক বার নগ্ন হয়ে ফুটল ভারতীয় ফুটবলের পরিকল্পনাহীন ও দিশাহীন রূপ।
ইস্টবেঙ্গলের দলটা প্রায় নতুন। আগের মরসুমের মূল কাঠামো ধরে রাখতে পারেননি লাল-হলুদ কর্তারা। নতুন দায়িত্ব নেওয়া পরিচিত কোচ আন্তোনিয়ো হাবাস হাতে ফুটবলারদের পেয়েছেন মাত্র চার-পাঁচ দিন। তুলনায় মোহনবাগানের অবস্থান কিছুটা স্বস্তির; তারা গত মরসুমের অধিকাংশ ফুটবলারকে রেখে দিতে পেরেছে। ফলে খেলায় বোঝাপড়ার কিছুটা ছায়া দেখা গেলেও, নতুন গ্রিক কোচ পানাজিয়োটিস দিমপেরিস অনুশীলনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাননি।
আরও পড়ুনঃ তিন পুরুষ মনে রাখবে, ধর্মতলায় ছাত্র আন্দোলনের নামে ‘তাণ্ডব’; প্রয়োগ হল গুন্ডাদমন আইন
বিরক্তিকর ফুটবল ও জয়সূচক গোল ম্যাচের ৫২ মিনিটে আব্দুল সামাদের গোলটি মোহনবাগানকে জয় এনে দিলেও, তা মূলতঃ ইস্টবেঙ্গলের জঘন্য রক্ষণের সুযোগ নিয়ে। মাঝমাঠে লাল-হলুদের মিস পাস থেকে আক্রমণ তৈরি করে সবুজ-মেরুন। মনবীরের মাপা ক্রস থেকে ফাঁকায় বল পেয়ে গোল করতে ভুল করেননি সামাদ; গোলরক্ষক প্রভসুখন সিংহ গিলের সেখানে কিছুই করার ছিল না।
প্রথমার্ধে মোহনবাগান চার-পাঁচ বার গোলের সুযোগ তৈরি করলেও ইস্টবেঙ্গল ছিল সম্পূর্ণ দিশাহীন। দ্বিতীয়ার্ধে মহম্মদ রশিদ নামার পর লাল-হলুদের খেলায় খানিক প্রাণ সঞ্চার হয়। ম্যাচের শেষ ১৫-১৬ মিনিট আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে গোল শোধ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে হাবাসের দল। রশিদ একাই দুটি সুযোগ নষ্ট করেন। ৯০ মিনিটের খেলায় মেরেকেটে ২৫-৩০ মিনিট ফুটবলের উত্তাপ ছিল, বাকি সময়টা স্রেফ দায়সারা প্রীতি ম্যাচের মতো গড়িয়েছে।
প্রস্তুতির চরম অভাব মোহনবাগান তুলনামূলক ভাল খেললেও দু’দলের খেলাই স্পষ্ট করে দিয়েছে প্রস্তুতির চরম অভাব। প্রাক-মরসুম অনুশীলনের বিন্দুমাত্র সুযোগ পাননি কোচেরা। ফুটবলারদের ‘ম্যাচ ফিটনেস’ ও আত্মবোঝাপড়া গড়ে ওঠার আগেই তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়েছে ডুরান্ড কাপে। দু’দলের ফুটবলাররাই অসংখ্য ভুল পাস বাড়িয়েছেন, বল পেয়ে সতীর্থকে খুঁজে পাননি। ৩০-৩৫ মিনিট খেলার পরই খেলোয়াড়দের হাঁপাতে দেখা গেছে।
বিদেশের ভরসা ও ফেডারেশনের ঔদাসীন্য মরসুমের প্রথম বড় ম্যাচে প্রথম একাদশে কোনো বিদেশি ছাড়াই দল নামাতে বাধ্য হন দুই কোচ। পরে ইস্টবেঙ্গলের দানি রামিরেজ ও রশিদ এবং মোহনবাগানের দেজান দ্রাজিচ মাঠে নামেন। টুর্নামেন্ট শুরুর দু’দিন আগেও ক্লাবগুলো জানত না কত জন বিদেশিকে নথিভুক্ত বা খেলাতে পারবে। বিদেশিদের ভিসার জন্য প্রয়োজন কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রকের অনাপত্তি পত্র (NOC), যা পেতে প্রশাসনিক উদ্যোগ দরকার। কিন্তু সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারা যখন বিশ্বকাপ দেখতে আমেরিকায় ব্যস্ত, তখন ঘরোয়া ক্যালেন্ডার নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কার!
আরও পড়ুনঃ কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের প্রথম পদক, ব্রোঞ্জ জিতে ইতিহাস গড়লেন ঝান্ডু কুমার!
অসংবেদনশীল আয়োজন ও বাজে মাঠ কলকাতা ডার্বি ভারতীয় ফুটবলের সেরা আকর্ষণ হলেও ডুরান্ড কাপের আয়োজকদের সে বিষয়ে দায়বদ্ধতা চোখে পড়েনি। ক্লাবগুলির সঙ্গে আলোচনা না করে, পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে সূচি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। দল গঠনের কাজ শেষ হওয়ার আগেই নামতে হচ্ছে খেলায়—যে সংস্কৃতি পাড়ার ফুটবলেও মানায় না। তার ওপর যুবভারতীর অসমান মাঠ ও বড় ঘাস ফুটবলারদের চোট পাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মাঠের মান ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা ছাড়া ভালো ফুটবল আশা করা যে অর্থহীন, এই ডার্বি ফের তা প্রমাণ করল।


